গিলোটিন কি ? guillotine meaning in bengali এক শিরচ্ছেদ যন্ত্র।

গিলোটিন কি ( guillotine meaning in bengali ) : ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের সাথে জড়িয়ে থাকা এক শিরচ্ছেদ যন্ত্রের ইতিহাস। guillotine meaning in bengali

পরিচয়: Guillotine এর বাংলা প্রতিশব্দ কর্তন-যন্ত্র, শিরকর্তক। গিলোটিন হলো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একটি বিশেষ যন্ত্র। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত অপরাধীর মৃত্যুকে দ্রুত, মানবিক ও কম কষ্টদায়ক করার জন্যই গিলোটিন নামক যন্ত্রের প্রচলন ঘটেছিল। এটি এক প্রকার ধারালো ও ভারী ধাতব পাত। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত অপরাধীকে নিচে রেখে গিলোটিন ফেলা হতো। ফলে স্বল্প সময়ে, অল্প বেদনায় অপরাধীর মৃত্যু ঘটত।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে গিলোটিনের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বর্তমানে পাঠা বলি দেওয়ার মতো পাঠা বা ছাগলকে যেভাবে নিচে রাখা হয়   ঠিক সেভাবেই অপরাধীকে যন্ত্রের নিচে রাখা হতো। তারপর ধারালো ফলা বা ধাতব পাতটি উপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হতো। তা গিয়ে গলায় আঘাত হানত। সাথে সাথেই স্বল্প সময়ে কম বেদনায় শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়ে যেত।

গিলোটিন আবিষ্কারের পূর্বে মৃত্যুদন্ড পদ্ধতি: পূর্বে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামিকে জনসমক্ষে নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হত। গিলোটিন আবিষ্কারের পূর্বে ইউরোপে প্রচলিত মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নানান উপায়ের মধ্যে বহুল প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যম ছিল অপরাধীকে ‘ভেঙ্গে ভেঙ্গে’ হত্যা করা। এই পদ্ধতিতে অপরাধীকে একটি চাকায় হাত পা টান টান করে বাঁধা হতো। এরপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী জল্লাদ মুগুর দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে তার শরীরের প্রত্যেকটি হাড় ভেঙ্গে ফেলতো।

ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি কি ছিল? সংঘটনের কারণ

জল্লাদ অপরাধীর দ্রুত মৃত্যু না হতে অপরাধীর হাত কিংবা পায়ের হাড়গুলো আগে পিটিয়ে ভেঙ্গে ফেলতো। এরপর ধীরে ধীরে পিটিয়ে পিটিয়ে অপরাধীর দেহের সমস্ত হাড় চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলতো। ফলে একসময় অমানবিক যন্ত্রণা ভোগ করতে করতে অপরাধীর মৃত্যু হতো।

তাছাড়া শিরশ্ছেদ পদ্ধতিও প্রচলিত ছিল। যে অস্ত্রের মাধ্যমে কুপিয়ে শিরশ্ছেদ করা হতো সেটি বেশি ব্যবহারের ফলে প্রায়ই ভোঁতা হয়ে যেত। ফলে শরীর থেকে মাথা আলাদা করতে জল্লাদকে কয়েকবার কোপ দিতে হতো। ফলে অপরাধীর খুবই মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু হতো।

গিলোটিনের আবিষ্কার: ১৭৮৯ এর ১৪ জুলাই বাস্তিল(ফরাসি বিপ্লবের সাথে লিংকাপ করে দিব) দুর্গে বন্দুকের আওয়াজের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এ সময় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমতার দাবী ছিল ” মৃত্যুদণ্ড পদ, শ্রেণী, মর্যাদা নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্যই সমান হতে হবে। এটি হতে হবে মানবিক, দ্রুত ও কম যন্ত্রণাদায়ক।” এই দাবির প্রেক্ষিতে ১৭৮৯ সালের ১০ অক্টোবর, এক ফরাসি চিকিৎসক ডা. জোসেফ-ইগনেস গিলোটিন (Joseph-Ignace Guillotin) (১৭৩৮-১৮১৪) ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির কাছে প্রস্তাব করেন যে, মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি সর্বদা একটি সাধারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে।

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার কি?এর বৈশিষ্ট্য। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

গিলোটিন আবিষ্কারক ডা. জোসেফ ইগ্নেস গিলোটিন জাতীয় পরিষদ বা বিধানসভার নিকট মৃত্যুদণ্ডকে সহজ করার বিশদ বিবরণ সম্বলিত ৬টি প্রবন্ধ পেশ করেন। পরিষদ গিলোটিনের প্রস্তাবনা প্রথম দিকে নাকচ করে দেয় কিন্তু পরবর্তীতে ১৭৯১ সালে তা গ্রহণ করে। এ যন্ত্রের নকশা বানিয়েছিলেন ফরাসি চিকিৎসক ডা. এন্টোনি লুইস।

ডা. গিলোটিনের দাবী বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য রাজার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এন্টোনি লুইসের অধীনে ডা. জোসেফ-ইগনেস গিলোটিন একটি কমিটি গঠন করেন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য নতুন একটি যন্ত্র উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। গিলোটিন আবিষ্কারক ডা. জোসেফ-ইগনেস গিলোটিন ও তার সহকর্মীরা ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রিটেনে প্রচলিত হালিফ্যাক্স গিব্বেট (Halifax Gibbet) ও স্কটিশ মেইডেন (Maiden) নামের দুটি পূর্ববর্তী শিরশ্চেদ যন্ত্র থেকে নতুন ও উন্নত একটি যন্ত্র তৈরির অনুপ্রেরণা লাভ করেন।

ফরাসি চিকিৎসক ডা. এন্টোনি লুইস, জার্মান প্রকৌশলী টোবিয়াস শ্মিড্টের (Tobias Schmidt)  সাথে, গিলোটিনের জন্য একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই গিলোটিন যন্ত্রে বাঁকা ব্লেডের পরিবর্তে একটি সোজা, কোণযুক্ত ফলক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে টোবিয়াস এটিতে ৪৫ ডিগ্রী কোণ সম্বলিত একটি লম্বা ব্লেড যুক্ত করেন। ডা. এন্টোনি লুইসের নামানুসারে যন্ত্রটির নাম রাখা হয় ‘লুইসেট্টে’। পরে যন্ত্রটির প্রথম প্রস্তাবক ও প্রবর্তক ডা. জোসেফ-ইগনেস গিলোটিনের নামানুসারে এই যন্ত্রের নাম রাখা হয় ‘গিলোটিন’ (Guillotine)।

গিলোটিন যন্ত্রের মাধ্যমে মুন্ডচ্ছেদ: ১৭৯২ সালের ২৫ এপ্রিল ডি গ্রিভ শহরের উন্মুক্ত প্রান্তরে এই যন্ত্রটি প্রতিস্থাপন করা হয় এবং সর্বপ্রথম একজন ‘হাইওয়ে ম্যান’ (Highwayman Nicolas Jacques Pelletier) এর মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়। গিলোটিন আবিষ্কারের এক বছরের মধ্যেই এটি ফরাসি বিল্পবের কুখ্যাত ‘Reign of Terror’ সময়কালের প্রধান প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। Reign of Terror এর সময় (জুন 1793 থেকে জুলাই 1794 পর্যন্ত) প্রায় 17,000 মানুষকে গিলোটিনে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল।

শিল্প বিপ্লব কি? উদ্ভব বিকাশ সময়কাল আলোচনা

1793 সালে ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই‌ (King Louis XVI) এবং রানী ম্যারি আতোয়ানেতকে (Queen Marie Antoinette) গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। Reign of Terror এর শেষ দিকে 1794 সালে ফরাসি বিপ্লবের নেতা জর্জেস ড্যান্টন (Georges Danton), সেন্ট-জাস্ট (Saint-Just) এবং ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre) কেও গিলোটিন যন্ত্র দ্বারা মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। জার্মানির নাৎসিরা 1933 থেকে 1945 সালের মধ্যে 16,500 বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিলোটিন ব্যবহার করেছিল। তাদের মধ্যে 10,000 বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল শুধুমাত্র 1944 এবং 1945 সালে।

পশ্চিম জার্মানিতে সর্বশেষ 1949 সালে গিলোটিন দ্বারা Richard Schuh এর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল। সর্বশেষ পূর্ব জার্মানিতে 1966 সালে Horst Fischer এর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
ফ্রান্সে গিলোটিনের শেষ প্রয়োগ হয় ১৯৭৭ সালে।এই সময় তুনিসিয়ান হামিদা নামক এক অপরাধী ছিলেন গিলোটিন দ্বারা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত শেষ ব্যক্তি।পশ্চিম জার্মানিতে ১৯৪৯ সালে, পূর্ব জার্মানিতে ১৯৮৭ সালে এবং ফ্রান্সে ১৯৮১ সালে এই ভয়ংকর প্রথা রহিত করা হয়।

১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এর মধ্যেই গিলোটিনে মৃত্যুর হার কমে আসে। ১৯৮১ সালে নতুন আইন প্রণয়ন করে ফ্রান্সে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হয় এবং সেই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় ‘গিলোটিন’ ব্যবস্থা। গিলোটিন আবিষ্কারক ডা. জোসেফ ইগনেস গিলোটিন ও তার নিজের মেশিন দ্বারা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হওয়া থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পায়। তিনি 1814 পর্যন্ত বসবাস করেন, এবং জৈবিক কারনে মারা যান।

guillotine meaning in bengali

 

Leave a Comment

Exit mobile version