১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ এর কারণ ও ফলাফল

 ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ (The Great Revolt, 1857) ছিল ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি সহিংস এবং অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ। বিদেশি শাসন শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, কোম্পানির দুঃশাসন ও নির্যাতনের শিকার দেশীয় সিপাহীদের অসন্তোষ বিদ্রোহের মূল কারণ। পরিণতিতে বিপ্লব সফল না হলেও ভারতে ১৭৫৭-১৮৫৮ পর্যন্ত মোট ১০০ বছরের কোম্পানির দুঃশাসনের অবসান ঘটে।

সূচীপত্রঃ

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ প্রথম বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল। লর্ড ক্যানিং এদেশের বড়ােলাট হয়ে আসার ( ১৮৫৬ খ্রি .) এক বছর পরেই সিপাহি বিদ্রোহ ঘটে। দেশীয় রাজা থেকে শুরু করে সাধারণ দেশবাসীর কেউই ব্রিটিশ শাসন মেনে নিতে পারেনি। এই বিদ্রোহের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা। বাংলায় শুরু হয়ে ইংরেজ-অধিকৃত ভারতের অন্যান্য এলাকায় সিপাহিদের মধ্যেও এই বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে।

১. রাজনৈতিক কারণ:

ক) দেশীয় শাসক বর্গের ইংরেজ বিরোধী মনোভাবঃ

১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানী লাভের পর ভারতীয় উপমহাদেশে কোম্পানির  আধিপত্য দ্রুততার সাথে বিস্তার হয়। লর্ড ক্লাইভের দ্বৈত শাসনের ফলে কোম্পানি বাংলায় তীব্র আর্থিক শোষণ শুরু করে। রাজস্ব আদায়কারীদের তীব্র অত্যাচার সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ট করে তোলে।

খ) লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতিঃ

১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে দেশীয় রাজ্যগুলোকে বিদেশি আক্রমণ হতে রক্ষার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোম্পানির অধীনে আসার জন্য বাধ্য করেন, সেই নীতিই অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি। ১৭৯৮ সালে হায়দ্রাবাদের নিজাম সর্ব প্রথম ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণ করেন। এরপর অযোধ্যা (১৮০১), মারাঠা (১৮০২), তাঞ্জোর, সুরাট, পুণা, সিন্ধিয়া (১৮০৩), ভোঁসলে (১৮০৩), হোলকার (১৮০৬) প্রভৃতি রাজ্যগুলি এই নীতিতে আবদ্ধ হয়ে ইংরেজদের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। ফলে ক্ষমতা হারানো দেশীয় রাজাদের ইংরেজদের প্রতি ক্ষোভ বাড়ে।

গ) লর্ড ডালহৌসির স্বত্ব বিলোপ নীতিঃ 

দেশীয় অপুত্রক রাজারা রাজ্য ও বংশ রক্ষা করার জন্য দত্তক পুত্র গ্রহণ করতেন। প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত এ প্রথা লর্ড ডালহৌসি বাতিল করে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, “কোম্পানি রাজ্যে যদি কোন মিত্র রাজা অপুত্রক হন, তাহলে তার রাজ্যকে ব্রিটিশ রাজ্যভুক্ত করা হবে। তিনি পোষ্য পুত্র রেখে গেলে তার কোন অধিকার স্বীকৃত হবেনা।” তিনি এ নীতি প্রয়োগ করে সুরাট (১৮৪২), সাতারা (১৮৪৮), নাগপুর (১৮৫৩), অযোধ্যা (১৮৫৬), ঝাঁসি (১৮৫৪), ভগৎপুর, করৌলি, সম্বলপুর (১৮৪৯), জৈৎপুর (১৮৪৯), ভাগৎ প্রভৃতি রাজ্য অধিকার করেন। এছাড়া তাঞ্জোর ও কর্ণাটকের নবাবের বৃত্তি এবং পোশোয়া দ্বিতীয় বাজীরাও এর দত্তক পুত্র নানা সাহেবের বৃত্তি বন্ধ করে দেন। ডালহৌসি মুঘল সম্রাটের উপাধি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

ঘ) উচ্চ রাজপদ থেকে ভারতীয়দের বাদঃ 

১৭৯৩ সালের মে মাসে লর্ড কর্ন ওয়ালিসের ভারত শাসন আইনে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তিত হয় এবং ফার্সী শিক্ষার বিলুপ্তি ঘটে। ফলে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করে ফার্সী শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলমানরা সরকারি চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটায়।

২. অর্থনৈতিক কারণঃ

ক) শাসকদের অবৈধ উপায়ে অর্থ আয়ঃ 

দেওয়ানী লাভের পর থেকেই কোম্পানির শাসকরা নানা রকম অবৈধ উপায়ে দেশীয় রাজন্যবর্গের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে থাকে। নাটোরের রানী ভবানী ও অযোধ্যার বেগমের সম্পদ লুট এবং অর্থ অনাদায়ে চৈৎসিংহের সিংহাসনচ্যুতি স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় জনগণ ও নবাবদের উত্তেজিত করে।

খ) চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ঘোষণাঃ 

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার ও কৃষকগণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সূর্যাস্ত আইন কার্যকর হবার পর অনেক জমিদার তাদের জমিদারি হারান। মুসলিম আমল হতে মুসলিম বাদশা বা নবাব প্রদত্ত যে লাখেরাজ সম্পত্তি মুসলমানরা ভোগ করত তা ইংরেজরা বাজেয়াপ্ত করে। শুধু বাংলাতেই ৫০ হাজার লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। এভাবে চাকরি হারা, জমিদারি হারা, সম্পত্তি ছাড়া মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।

সিপাহী বিদ্রোহ এর অপর নামঃ সিপাহি বিদ্রোহকে ভারতের প্রথম বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ, মহাবিদ্রোহ, ভারতীয় বিদ্রোহ, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ও ১৮৫৮ সালের গণ-অভ্যুত্থান নামেও অভিহিত করা হয়।

গ) সিপাহীদের বেতন বৈষম্যঃ 

ইংরেজ সেনাবাহিনীতে কর্মরত মোট ৩ লক্ষ ১৮ হাজার ২০ জন সিপাহী ও দেশীয় কর্মচারীদের জন্য ব্যয় করা হত মাত্র ১৮ লক্ষ পাউন্ড। ৫১ হাজার ৩১৬ ইউরোপীয় কর্মচারী ও সৈনিকদের পিছনে ব্যয় করা হত ৫৬ লক্ষ ৬৮ হাজার পাউন্ড। এ বৈষম্য দেশীয় সিপাহীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

ঘ) দেশীয় শিল্পের অপমৃত্যুঃ

মুসলিম শাসনামলের শাসকদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় দেশীয় শিল্পের চরম বিকাশ ঘটে। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০০ বছর ধরে ইংরেজরা ভারতবর্ষ থেকে সোনা, রূপা মূল্যবান ধাতু নিজেদের দেশে পাচার করলেও ভারতবর্ষে কোন শিল্প কারখানা গড়ে তোলেনি। ভারতবর্ষকে বিলাতি পণ্যের বাজার হিসেবে গড়ে তোলে। ফলে দেশীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে লাখ লাখ পরিবার বেকার হয়ে পড়ে। ইংরেজদের বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে পৃথিবী বিখ্যাত ঢাকাই মসলিনের মৃত্যু ঘটে।

৩. ধর্মীয় ও সামাজিক কারণঃ

ক) খ্রিস্টধর্মের প্রচারঃ 

ঊনবিংশ শতাব্দীতে খ্রিস্টান পাদ্রিরা হাট-বাজার, স্কুল-হাসপাতাল, জেলখানার কয়েদিদের মধ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার করতে থাকে। তারা এতিম, অসহায় ও বিপদগ্রস্তদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করত এবং সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতায় তাদেরকে খ্রিস্ট ধর্মে আকৃষ্ট করার জন্য নানাভাবে লোভ দেখাত। ১৮৫৬ সালে এক আইনে বলা হয় যে, কোন হিন্দু খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে তাকে পৈর্তৃক সম্পত্তি ভোগের অধিকার দেয়া হবে। এতে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

খ) জনগণের সন্দেহঃ 

ইংরেজদের সমাজ সংস্কার মূলক কাজ যেমন- সতীদাহ প্রথা নিবারণ, বিধবা বিবাহ আইন, শিশু হত্যা নিবারণ, ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তন, নারী শিক্ষার ব্যবস্থা, রেলগাড়ি ও টেলিগ্রাফের প্রচলন হলে ভারতীয়রা নিজ নিজ ধর্ম নষ্ট হবার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। হিন্দুরা সমুদ্রযাত্রাকে ধর্মচ্যুতির কারণ বলে মনে করত। কিন্তু General Service Englishmen Act পাস করে ভারতীয় সিপাহীদের উপমহাদেশের বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হলে ভারতীয় হিন্দু-মুসলিম সিপাহীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

৪. সামরিক কারণঃ 

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল সিপাহীদের বেতন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য। সামরিক কারণে দূরদেশে অবস্থানকালে ইংরেজ সৈন্যরা ভাতা পেলেও ভারতীয় সিপাহীরা পেতনা। ব্রিটিশ অফিসারদের উদ্ধত ও অপমানজনক আচরণ, সিপাহীদের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রচারে উৎসাহ দেয়া, কপালে তিলক লেপন, দাঁড়ি রাখা ও পাগড়ী পরা নিষিদ্ধ করার কারণে সিপাহীরা ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

৫. প্রত্যক্ষ কারণঃ 

১৮৫৬ সালে সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেল নামে এক ধরনের আধুনিক বন্দুকের ব্যবহার শুরু হয়। ব্যবহারের পূর্বে এর কার্তুজ দাঁত দিয়ে কাটতে হত। গুজব রটে যে, উক্ত রাইফেলে গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত কার্তুজের প্রচলন করে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ধর্ম ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে। ফলে দেশীয় সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

1857 সালের বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ‘এনফিল্ড’ রাইফেলের প্রবর্তন।

বিদ্রোহের ঘটনাবলিঃ 

১৮৫৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদের বহরমপুর সেনানিবাসে চর্বি মিশ্রিত কার্তুজ নিয়ে বিদ্রোহ দেখা দেয়। ২৯ মার্চ বাংলার ব্যারাকপুর সেনানিবাসে মঙ্গল পান্ডে নামক এক ব্রাহ্মণ সিপাহী বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং দুইজন ইংরেজ অফিসারকে গুলি করে হত্যা করেন। বৃটিশ কর্তৃপক্ষ মঙ্গল পান্ডেকে ফাঁসিতে ঝুলায়।

মঙ্গল পাণ্ডে ছিলেন সিপাহী বিদ্রোহ এর প্রথম শহীদ

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ এর কারণ ও ফলাফল
সিপাহী বিদ্রোহ এর প্রথম শহীদ মঙ্গল পাণ্ডে

১০ মে মীরাটের সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং দিল্লী দখল করে। বিদ্রোহ ক্রমে দিল্লি, অযোধ্যা, কানপুর, লখনৌ, বেরিলি, ঝাঁসি, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে বিস্তৃত হয়। ১১ মে তারা ৮২ বছর বয়স্ক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্কে বাদশা ঘোষণা দেয়। বেরেলী সেনানিবাস থেকে জেনারেল বখত খান ১৪০০ সৈন্য নিয়ে দিল্লিতে এসে সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। বখত খান ইংরেজ-শিখ সম্মিলিত বাহিনীর হাত থেকে দিল্লিকে ৪ মাস ধরে রক্ষা করেন। বাংলাদেশে ঢাকা- চট্টগ্রাম ছাড়া কোথাও সিপাহী বিদ্রোহ লক্ষ্য করা যায় নি।

সম্রাট বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং তার কৃতিত্ব

৩৪ রেজিমেন্টের সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে, ১৮৫৮ সালের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামে সিপাহীরা হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে অস্ত্রাগার লুন্ঠন করেন। ২২ নভেম্বর ঢাকায় সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে লালবাগ কেল্লা দখল করে রাখে। ইংরেজদের সাথে এক প্রচন্ড যুদ্ধে সিপাহীরা পরাজিত হয়ে পলায়ন করে এবং বহু সিপাহী ইংরেজদের হাতে বন্দী হয়। ইংরেজরা বন্দী সিপাহীদের নির্মমভাবে বাহাদুর শাহ পার্কে ফাঁসি দেয়। ১৮৫৮ সালের জুলাই মাসে সমগ্র ভারতে বিদ্রোহ দমিত হয়।

বিদ্রোহের প্রকৃতিঃ 

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ এর প্রকৃতি নিয়ে সমকালীন ও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। উৎস ও ঘটনাবলির বিবেচনায় কারো মতে এটি সিপাহী বিদ্রোহ, কারো মতে জাতীয় সংগ্রাম, কারো মতে কৃষক আন্দোলন, কারো মতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশীয় সামন্ত প্রভুদের শেষ প্রতিরোধ। তদানীন্তন ভারত সচিব আর্ল স্ট্যানলি তাঁর লেখায় সিপাহী বিদ্রোহ কথাটি ব্যবহার করেন। ডিজরেলী উক্ত ঘটনাকে জাতীয় বিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করেন। আউটরাম একে সুপরিকল্পিত বৃটিশ বিরোধী সংগ্রাম বলে মত প্রকাশ করেন। ঐতিহাসিক কেভ ব্রাউন, টি.খালদুন, আই.এইচ.কোরেশী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ একে মুসলিম অভিজাতদের পরিকল্পিত বিদ্রোহ বলে মন্তব্য করেন। প্রকৃতপক্ষে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ছিল একটি জাতীয় আন্দোলন।

বিদ্রোহের ফলাফলঃ

ক) কোম্পানি শাসনের অবসানঃ

১৮৫৭-৫৮ সালের বিদ্রোহের পর কোম্পানির দূর্বল শাসনের ফলে বৃটিশ সরকার অনুধাবন করে যে, একটি বণিক সম্প্রদায়ের হাতে ভারতের মতো এত বড় সাম্রাজ্যের শাসনভার ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ নয়। তাই ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Act for the Better Government of India প্রণয়ন করে ভারতবর্ষের শাসনভার ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার হাতে অর্পণ করে। ইংল্যান্ডের মন্ত্রীদের মধ্য থেকে একজনকে ভারত সচিব পদে নিযুক্ত করা হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, তিনি ১৫ সদস্য নিয়ে গঠিত একটি কাউন্সিলের সাহায্যে ভারত শাসন করবেন। ভারতের বড়লাট ভাইসরয় নামে অভিহিত হন এবং প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড ক্যানিং।

খ) মুসলমানদের উপর নির্যাতনঃ 

এ মহা বিদ্রোহের জন্য ইংরেজরা সম্পূর্ণভাবে মুসলমানদেরকেই দায়ী করে। ফলে বহু মুসলমানদের উপর নির্যাতন, অত্যাচার ও প্রাণদণ্ড দেয়া হয় এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

গ) স্বত্ব বিলোপ নীতির বিলুপ্তিঃ 

১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণা বলে ইংরেজদের রাজ্য বিস্তারনীতি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত হয়। দেশীয় রাজণ্যবর্গের মর্যাদা, অধিকার এবং প্রচলিত রীতিনীতি রক্ষা করা হয়। দত্তক পুত্র গ্রহণের রীতি প্রচলন হয় এবং ভারতীয়দের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হয়।

The Devil’s Wind: দ্য ডেভিলস উইন্ড মনোহর মালগোঙ্করের একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস যা মারাঠা কনফেডারেসির শেষ পেশওয়ার উত্তরাধিকারী নানা সাহেবের গল্প বলে, যিনি 1857 সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। এটি এমন একজন ব্যক্তির সহানুভূতিশীল প্রতিকৃতি প্রদান করে যাকে ব্রিটিশরা একজন মহান ভিলেন হিসাবে চিত্রিত করেছিল এবং যতদূর সম্ভব ঐতিহাসিক সূত্রের উপর ভিত্তি করে। বইটি একটি আত্মজীবনী হিসাবে লেখা যেখানে নানা সাহেব তাঁর নিজের কথায় তাঁর জীবন বর্ণনা করেছেন।

ঘ) সেনাবাহিনী ও অর্থনীতির উপর প্রভাবঃ 

হাজার হাজার বিদ্রোহী সিপাহীদের প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করে তা পুনর্গঠন করা হয়। গোলন্দাজ বাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয় এবং উচ্চপদে তাদের পদোন্নতি বন্ধ রাখা হয়। সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নতুন করের বোঝা এদেশবাসীর উপর চাপানো হয়। ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ পণ্যের বাজার হিসেবে গড়ে তোলে দেশীয় শিল্প ধ্বংস করা হয়।

ঙ) মোগল সম্রাটের অধিকার বিলুপ্তঃ 

বিদ্রোহী সিপাহীরা যাঁকে নেতা বলে ঘোষণা করেছিল, সিপাহী বিদ্রোহ এর পর সেই ৮০ বছরের বৃদ্ধ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে গ্রেপ্তার করে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। ১৮৬২ সালে তার মৃত্যু হয়।

চ) বিকেন্দ্রীকরণ নীতিঃ 

১৮৩৩ সালের সনদ আইনের কেন্দ্রীভূত করণ নীতি পরিবর্তন করে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করা হয়। ১৮৬১ সালের ভারতীয় কাউন্সিল আইন দ্বারা বোম্বাই ও মাদ্রাজ সরকারের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া হয়।

সিপাহী বিদ্রোহ এর ব্যর্থতার ছিলঃ অর্থ, রসদ, সমর উপকরণ ও রণকৌশলের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যেকার বিরাট পার্থক্য।  সিপাহীরা ছিল সীমিত অর্থ, নিকৃষ্টমানের অস্ত্রশস্ত্র ও পুরাতন যুদ্ধপদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল।

উপসংহারঃ 

এ বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। সিপাহী বিদ্রোহ এর ফলে ১৭৫৭-১৮৫৭ সাল পর্যন্ত কোম্পানির ১০০ বছরের শাসন বিলুপ্ত হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের শাসনভার ব্রিটিশ রাজা ও পার্লামেন্টের হাতে অর্পিত হয়। দেশীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী চাকুরী সহ দেশ শাসনে অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়। ফলে জাতীয় চেতনা ও দেশাত্মবোধের সৃষ্টি হয়।

Leave a Comment