সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা ? সিন্ধু সভ্যতার উত্থান।

সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা:

সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এই ব্যাপারে চারটি মতবাদ দেখা যায়। দ্রাবিড় শ্রেষ্ঠ মতবাদ, সুমেরীয় সৃষ্ট মতবাদ, আর্য সৃষ্ঠ মতবাদ এবং মিশ্র জাতি মতবাদ।

১) দ্রাবিড় সৃষ্ট মতবাদ: 

ঐতিহাসিক জন মার্শাল, ফাদার হেরাস, আর ডি ব্যানার্জি এই মতবাদের প্রবক্তা। তাদের মতবাদ এর পক্ষে যুক্তি হলো:
১) আর্যদের আগমনের পূর্বে দ্রাবিড় জাতি ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে বেলুচিস্তানের পাহাড়ি ব্রাহুই উপজাতি দ্রাবিড় ভাষায় কথা বলে। এর থেকে বলা যায় ভারতে আর্যদের আগেই ড্রাইভের সভ্যতার বিকাশ ঘটে। তাই বলা যায় তারা দ্রাবিড়রা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা।
২) সিন্ধু বাসীদের ধর্মীয় আচরণ এর দিক থেকে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায়।
৩) দ্রাবিড় জাতি উন্নত কৃষি, বাণিজ্য ও নগর পরিকল্পনার সাথে পরিচিত ছিল। সিন্ধু সভ্যতায় ও এসবের অস্তিত্ব ছিল।
৪) সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত নর কঙ্কাল এর সাথে ভারতীয় মুন্ডা ও দ্রাবিড়ের কঙ্কালের মিল পাওয়া যায়।

বিরুদ্ধে যুক্তি: ১) মৃতদেহ সমাহিত করা বা অন্তোষ্টিক্রিয়া যে পদ্ধতি আরোপ করা হয় তাদের দুই সংস্কৃতির মধ্যে মিল পাওয়া যায় না।
২) দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়দের তৈরি স্থাপত্যের সাথে সিন্ধু সভ্যতার মিল পাওয়া যায় না।
৩) বেলুচিস্তানের ব্রাহুই জাতি প্রকৃত দ্রাবিড় নয়, তারা তুর্কি- ইরানি মিশ্রিত উপজাতি।

২) সুমেরীয় সৃষ্ট মতবাদ: 

স্যার মর্টিমার হুইলার মনে করেন সুমেরীয়রা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা। এ মতবাদের পক্ষে যুক্তি হলো:
১) সুমেরীয় ও সিন্ধু উভয় সভ্যতায় উন্নত নগর পরিকল্পনা, নগর জীবন ও সংস্কৃতির মিল পাওয়া যায়।
২) উভয় সভ্যতা গড়ে ওঠে নদীর তীরে। উভয় সভ্যতার মানুষ মাতৃ পূজা করত। দুটি সভ্যতায় তাম্র যুগের সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা

বিপক্ষে যুক্তি:
১) সুমেরীয় ও সিন্ধু সভ্যতার ভাস্কর্য, পোড়ামাটির কাজ, লিপির ক্ষেত্রে পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে।
২) সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য শস্যাগার, বৃহৎ স্নানাগার এর অস্তিত্ব সুমেরীয় সভ্যতায় পাওয়া যায়নি।
৩) ইমারত, নর্দমা,পয়ঃপ্রণালীর ক্ষেত্রে এই দুই সভ্যতার মধ্যে মিল পাওয়া যায়নি।
৪) পোশাক-পরিচ্ছদ এবং কবর দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই দুই সভ্যতার মধ্যে মিল পাওয়া যায়নি।
৫) সিন্ধু অধিবাসীরা সেচ পদ্ধতি সম্পর্কে জানত না। কিন্তু সেচ পদ্ধতি সুমেরীয়দের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন।

সিন্ধু-সভ্যতার-আর্থ-সামাজিক-ধর্মীয়-ও-রাজনৈতিক-অবস্থা
সিন্ধু-সভ্যতার-নগর
৩) আর্য সৃষ্ট মতবাদ:

সিন্ধু নগরে প্রাপ্ত নিদর্শন এর ভিত্তিতে বলা হয় আর্যরা সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা। এই মতবাদের পক্ষে যুক্তি হলো:
১) সিন্ধু সভ্যতায় আর্য জাতির কঙ্কাল পাওয়া গেছে। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা
২) আর্যদের অলংকার, খোঁপা বাধার রীতি, খাদ্য এবং পোশাক-পরিচ্ছদের সাথে সিন্ধু অধিবাসীদের মিল পাওয়া গেছে।
৩) আর্যদের প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপির সাথে সিন্ধু লিপির মিল পাওয়া যায়।
৪) এই লিপির পরিণত রূপ পাওয়া যায় আর্য সভ্যতায়।
৫) সিন্ধু সভ্যতার সিল, টেরাকোটার সাথে আর্য সভ্যতার মিল পাওয়া যায়।

গ্রিক সভ্যতার উদ্ভব ও গ্রিকদের অবদান এবং এথেন্স ও স্পার্টা।

বিপক্ষে যুক্তি:
১) সিন্ধু সভ্যতার নগর কেন্দ্রিক কিন্তু আর্য সভ্যতা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক।
২) আর্য ভাষা ও সিন্ধু ভাষার মিল পাওয়া যায়নি।
৩) সিন্ধুরা লিখন পদ্ধতি জানত কিন্তু আর্যরা জানত না।
৪) আর্যরা লোহার ব্যবহার জানতো কিন্তু সিন্ধু সভ্যতায় লোহার ব্যবহার ছিল না।

গ্রিক সভ্যতার উদ্ভব ও গ্রিকদের অবদান এবং এথেন্স ও স্পার্টা
গ্রিক সভ্যতার উদ্ভব ও গ্রিকদের অবদান এবং এথেন্স ও স্পার্টা 

৫) আর্যরা গরু এবং পুরুষ দেবতার পূজা করতো। লিঙ্গ পুজার বিরোধিতা করত। অপরপক্ষে সিন্ধুবাসীরা ষাঁড়, শিবলিঙ্গ ও নারী দেবীর পূজা করত।
৬) সিন্ধু সভ্যতার বাড়ি ঘর ছিল ইটের তৈরি। অপরদিকে আর্যদের বাড়িঘর ছিল কাঁচা।
৭) সিন্ধু সভ্যতার জনজীবনে বাণিজ্য,শিল্প গুরুত্ব পেয়েছিল। আর্যরা প্রধানত কৃষি ও পশুজীবী ছিল।
৮) আর্যদের গ্রন্থ ঋকবেদের রচনাকাল ১৫০০ বা ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। অথচ, সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল আরও দেড় হাজার বছর আগে।
এইসব যুক্তির কারণে এই মতবাদ জন মার্শাল, বাসামের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা

৪) মিশ্র জাতি গোষ্ঠী মতবাদ: 

আধুনিক গবেষকগণ মনে করেন ভারতীয় উপমহাদেশের ভেতর থেকেই এক স্বকীয় ধারাই সিন্ধু সভ্যতার উত্থান হয়েছিল। বাসাম, এফ.আর.অলচিন এইমত সমর্থন করেন।
ড.গুহ মনে করেন, মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পায় প্রাপ্ত নর কঙ্কাল, মাথার খুলি ও চোয়াল কোন একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছিলনা, তিনটি জনগোষ্ঠীর দ্বারা গঠিত। এগুলো হলো-প্রোটো অস্ট্রালয়েড, ভূমধ্যসাগরীয় জাতি বা মেরিডিয়ান এবং মঙ্গোলীয় গোত্রের আলপাইন। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা

অস্ট্রালয়েডরা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের সাথে সম্পৃক্ত। আলপাইনরা সম্ভবত চীন, নেপাল, আসাম থেকে সিন্ধুতে আসে। দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে এখনো প্রোটো অস্ট্রালয়েড এবং মেডিটেরিয়ান জাতির মিশ্রন দেখা যায়। ডক্টর ডিকে সেন কোন জাতিগোষ্ঠীর নাম উল্লেখ না করে সিন্দুর কিছু কঙ্কাল পরীক্ষা করে বলেন একটি জাতি গোষ্ঠী দ্বারা সিন্ধু সভ্যতা গড়ে ওঠে। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা সম্পর্কে সঠিক কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও বর্তমানে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতা একটি জনগোষ্ঠী নয় বরং একাধিক জনগোষ্ঠীর দ্বারা গঠিত হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা

আরো পড়ুন…

সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার, জন্ম, খননকার্য, সময়কাল এবং পতন

1 thought on “সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা ? সিন্ধু সভ্যতার উত্থান।”

Leave a Comment