সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ।

খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০০ অব্দে সিন্ধু নদ কে কেন্দ্র করে যে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে ওঠে তা হলো সিন্ধু সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হল। সিন্ধু সভ্যতা প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৯২১ সালে। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো অঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। একে অনেকে হরপ্পা সভ্যতা বলে অভিহিত করেন। বর্তমানে বহুসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আবিষ্কৃত হওয়ায় ভারত এবং পাকিস্তানের অনেক এলাকায় সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি একটি নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা ছিল। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ আধুনিক প্রত্যেক মনে করেন সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা মিশ্র জাতি। জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা কৃষির উপর নির্ভরশীল হলেও শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে ছিল।

সিন্ধু সভ্যতার সমাজ ব্যবস্থা:

সিন্ধু সভ্যতার সমাজে শ্রেণীভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল কিন্তু বর্ণ প্রথা প্রচলিত ছিল না।

শ্রেণিভেদ প্রথা:

       সিন্ধু সভ্যতার সমাজ চার শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল।যথা:
১) প্রথম শ্রেণী: শাসক, পুরোহিত, চিকিৎসক, জ্যোতিষী।
২) দ্বিতীয় শ্রেণি: যোদ্ধা।
৩) তৃতীয় শ্রেণি: ব্যবসায়ী, শিল্পী, কারিগর।
৪) চতুর্থ শ্রেণি: শ্রমজীবী শ্রেণী অর্থাৎ কৃষক, জেলে, তাঁতী, মিস্ত্রি, গৃহকর্মী ইত্যাদি এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সভ্যতার উঁচু এলাকায় ধনি লোকজন বসবাস করত। তাঁদের বাড়ি গুলো ছিল বহু কক্ষ বিশিষ্ট। সভ্যতার নিচু এলাকায় সাধারণ লোকজন বসবাস করত। তাদের বাড়িগুলোর ছিল দুই কক্ষ বিশিষ্ট। পোড়ামাটির ইট দিয়ে বাড়িগুলো নির্মাণ করা হতো। বৃহৎ প্রাসাদ, দুর্গ, ক্ষুদ্র দু কামরার ঘর ধনী-দরিদ্র শ্রেণীর বৈষম্যের প্রমাণ দেয়। সিন্ধু সভ্যতায় শ্রেণীভেদ প্রথার প্রধান কারণ ছিল পেশা। কৃষি, রসায়ন শিল্প, মৃৎপাত্র, ইট তৈরি ইত্যাদি তাদের বিভিন্ন পেশার সাথে সম্পৃক্ততার প্রমাণ দেয়। মর্টিমের হুইলার মতে, দুর্গের শাসকরা জমি আবাদকারী কৃষকদের ভূমি দাসে পরিণত করেছিল।

খাদ্য: 

সিন্ধু সভ্যতা লোকজনের প্রধান খাদ্য ছিল গম বার্লি এবং সম্ভবত ভাত।নগরবাসীরা গরু ছাগল হাঁস মুরগি শুকর কচ্ছপ ইত্যাদির মাংস খেত। মাছ ছিল সাধারণ খাদ্য। এছাড়া সবজি, ফল বিশেষ করে খেজুর তাদের খাদ্য তালিকায় ছিল।

পোশাক-পরিচ্ছদ:

       সিন্ধু সভ্যতায় আবিষ্কৃত মূর্তি থেকে তাদের পোশাক পরিচ্ছদ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পুরুষেরা ধুতি এবং চাদর পরতো। মহিলারা দুই প্রশ্ন কাপড় পরিধান করতো। পুরুষ মহিলা উভয়ই বড় চুল রাখত এবং অলংকার পরত।

সিন্ধু সভ্যতার অর্থনৈতিক অবস্থা:
কৃষি: 

সিন্ধু বাসীদের প্রধান জীবিকা কৃষি হলে ও তারা শিল্প এবং বাণিজ্যে এগিয়ে যায়। সিন্ধু উপত্যকা, কালিবঙ্গান, হরপ্পায় চাষাবাদের কিছু নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। গম, যব, তিল, তুলা, মুগ, মসুর, সর্ষে, বাজরা ছিল তাদের উৎপন্ন দ্রব্য। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দে লোথালবাসী ধান উৎপন্ন করেছে বলে অনুমান করা হয়। তাদের বৃহৎ শস্যাগার কৃষি সমৃদ্ধির কথা জানান দেয়।

গ্রিক সভ্যতার উদ্ভব ও গ্রিকদের অবদান এবং এথেন্স ও স্পার্টা।

পশুপালন:

       গৃহপালিত পশুর মধ্যে কুঁজবিশিষ্ট ষাঁড়, মহিষ, মেষ, শুকর, বিড়াল, হাতি উল্লেখযোগ্য। ষাঁড়কে কৃষি কাজে ব্যবহার করা হতো।কুকুরকে প্রিয় পোষা জীব হিসেবে দেখা হতো। উট এবং গাধা ছিল ভারবাহী প্রাণী।

ব্যবসা বাণিজ্য: 

মহেঞ্জোদারো সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। কারিগররা পর্যাপ্ত পরিমাণে দ্রব্য উৎপাদন করত। ফলে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য গড়ে ওঠে। সিন্ধু বাসিরা শিল্পের কাঁচামাল রূপা, তামা বাইরে থেকে আমদানি করত। তারা হাতির দাঁতের তৈরি জিনিস, মণিমুক্তা, ময়ূর রপ্তানি করত। মিশর, চীন, আফগানিস্তান, পারস্য, সুমেরীয় ও ক্রিট সভ্যতার সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ এর প্রমাণ পাওয়া যায়।এছাড়া দক্ষিণ ভারত, মধ্য ভারত এবং উত্তর ভারতের সাথে তাদের বাণিজ্য ছিল।

শিল্প: 

সিন্ধু সভ্যতায় বিভিন্ন ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছিল। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো এর বাসিন্দারা তুলা ও পশম দ্বারা বস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী ছিল। মৃৎশিল্পীরা চীনা মাটির পাত্র তৈরি করত। তামা ও ব্রোঞ্জ এর সাহায্যে অস্ত্রশস্ত্র হাতিয়ার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন করা হতো। হাতির দাঁতের সাহায্যে চিরুনি এবং সূঁচ উৎপন্ন হত। অলংকার তৈরিতে ও তারা পারদর্শী ছিল।

ওজন: 

ওজন পরিমাপ করার জন্য বাটখারা ব্যবহার করা হতো। ছোট বাটখারা ছিল চারকোনা এবং বড় বাটখারা ছিল গোলাকার। দৈর্ঘ্য পরিমাপের জন্য স্কেল এর মত লাঠি ব্যবহার করা হতো। তাদের ওজন ছিল ১৬ ভিত্তিক। যথা: ১৬,৬৪,১৬০,৩২০,৬৪০….

সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় অবস্থা: 

মন্দিরের অনুপস্থিতি এবং লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়ায় সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না।আবিষ্কৃত সীলমোহর, মূর্তি থেকে সে যুগের ধর্ম বিশ্বাস সম্পর্কে জানা যায়।

প্রাকৃতিক শক্তির আরাধনা: 

সিন্ধু সভ্যতায় গাছপালা নদ-নদী জীবজন্তুর পূজা প্রচলিত ছিল। তারা পিপল নামক গাছ কে পবিত্র মনে করত।মহেঞ্জোদারোতে প্রাপ্ত সিলমোহরে অশ্বত্থ গাছের মধ্যে এক দেবতা, মৎস্যপ্রতীম প্রতীক, বড় ছাগল পাওয়া যায়। একজোড়া বাঘের সাথে লড়াই রত পুরুষের সীলমোহর ও পাওয়া যায় যা দ্বারা গিলগামেশের অনুরূপ কিছু বোঝানো হয়েছে। এছাড়া সীলমোহর থেকে জানা যায়, তারা এক শিং বিশিষ্ট চতুষ্পদী প্রাণী ইউনিকর্ন এবং কুঁজওয়ালা ষাঁড়ের পূজা করত।

দেব দেবীর আরাধনা: 

সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত পোড়ামাটির মূর্তি থেকে জানা যায় তারা মূর্তিপূজা করত। প্রাপ্ত নারী মূর্তি থেকে জানা যায় তারা মাতৃ পূজা করত। কিন্তু হরপ্পার দেবমূর্তি থেকে কি মনে হয় মাতৃদেবী গৌণ আরাধনার দেবী ছিলেন। এছাড়া তারা শিব মূর্তি, লিঙ্গ মূর্তি পূজা করত বলে জানা যায়।

মন্দির: 

সিন্ধু সভ্যতায় মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অনেকে হরপ্পার প্রাসাদগুলো কে মন্দির বললেও বাসাম তা স্বীকার করেননি।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া: 

মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা, লোথাল ও কালিবঙ্গান এ প্রাপ্ত সমাধি থেকে মৃতদেহ সমাধিস্থ করার তিন রকমের ব্যবস্থা জানা যায়। মৃত দেহ কবর দেওয়া হত। মৃতের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং অলংকার কবরে রাখা হতো। এগুলো পূর্ণ কবর ছিল। কোন কোন স্থানে মৃতদেহ দাহ করে কবর দেয়া হতো।

সমাধি: 

কালিবঙ্গান এ ইটের তৈরি সমাধি পাওয়া গেছে। লোথালে সমাধি ক্ষেত্রে নারী পুরুষের পাশাপাশি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। মৃতদেহের কবরে জিনিসপত্র রাখায় তাদের পরলোকে বিশ্বাস ছিল বলে অনেকে মনে করেন।

সিন্ধু সভ্যতার রাজনৈতিক অবস্থা: 

হিন্দু সভ্যতার রাজ শক্তি ছিল কিনা তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও সিন্ধু বাসীদের পরিকল্পিত নাগরিক জীবন প্রমাণ করে যে এখানে একটি দক্ষ সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা নগরের অবকাঠামো এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য থেকে মনে করা হয় সম্পূর্ণ সভ্যতা একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনে ছিল। স্টুয়ার্ট পিগট মনে করেন সিন্ধু উপত্যকা মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার অধীনে অন্যান্য জায়গা গুলো শাসিত হতো। সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত শীল গুলো প্রমাণ করে রাজ্য পরিচালনায় যাজক রাজা প্রধান ছিলেন।

তার কারণ হিসেবে বলা হয়, সামরিক মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় ধর্ম এবং প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে একই ব্যক্তি ছিলেন। সিন্ধু সভ্যতায় ও এরূপ ব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। মহেঞ্জোদারোর দুর্গ থেকে বলা যায় এখানে প্রশাসনিক কর্তৃত্বের উপস্থিতি ছিল। পরিকল্পিত নগর জীবন, বৈদেশিক বাণিজ্য, ওজন, পরিমাপ ব্যবস্থা, বৃহৎ স্নানাগার, হলরুম এবং শস্যাগার সিন্ধু সভ্যতায় প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রমাণ দেয়। তাছাড়া নগরের উঁচু স্থানে ছিল ধনীদের বসবাস এবং নিচু স্থানে ছিল গরিবদের বসবাস। এ অবস্থা থেকেও বলা যায় এই সভ্যতায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল।

ব্লগ লেখকঃ রবিউল আলম ফাহিম

1 thought on “সিন্ধু সভ্যতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিশ্লেষণ।”

Leave a Comment