সম্রাট বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং তার কৃতিত্ব

সম্রাট বাবর ছিলেন ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। ভারতবর্ষে মোগল রাজবংশের সূচনা ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ও মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। দিল্লির সুলতানি শাসনের পতনের যুগে পরাক্রমশালী কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অনৈক্য ও বিচ্ছিন্নতা আত্মপ্রকাশ করেছিল। তখনই ১৫২৬ সালে মুঘল নেতা বাবর বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজশক্তিকে অবদমিত করে পুনরায় পরাক্রমশালী কেন্দ্রীয় শক্তির অধীনে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এক নতুন রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।

ইতিহাসে বাবর প্রতিষ্ঠিত রাজবংশটি মুঘল রাজবংশ নামে পরিচিত। ভারতবর্ষে বাবর মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সম্রাট বাবর এর পুরো নাম জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর। 

প্রাথমিক জীবন:

সম্রাট বাবর (জহির উদ্দিন মুহম্মদ বাবর) ছিলেন ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ১৪৮৩ সালে মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তানের এক ক্ষুদ্র রাজ্য ফারঘানায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবরের পিতা ওমর শেখ মির্জা ছিলেন দুর্ধর্ষ সমর নেতা তৈমুরের বংশধর এবং ফারঘানা রাজ্যের অধিপতি। তার মাতা কুতলুঘ নিগার খানম ছিলেন মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের বংশধর। তবে তিনি তার আত্মজীবনী বাবরনামায় নিজেকে ‘চাঘতাই তুর্কি‘ বলে পরিচয় দিয়েছেন।

বাবর শব্দের অর্থ বাঘ।

সিংহাসন আরোহণ: 

সম্রাট বাবর এর পিতা ওমর শেখ মির্জা ছিলেন ফারঘানা রাজ্যের আমির। বড় ভাই আহমদ মির্জা ও শ্যালক মাহমুদ খানের সাথে ওমর মির্জার প্রবল শত্রুতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ১৪৯৪ সালে ওমর শেখ মির্জা তার এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বের হন। তবে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে সম্রাট বাবর মাত্র ১১ বছর বয়সে সিংহাসনে উপবেশন করেন।

মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর:
বাবরের মুদ্রা। image src: wikimedia commons

সম্রাট বাবর এর বাবা ছিলেন একজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিক পিতৃ রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয় এবং আত্মীয়বর্গ দ্বারা প্রতারিত হয়ে তিনি ভারতের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। দিল্লির লোদী সুলতানরা দূর্বল হলেও আফগান সর্দাররা এবং রাজপূতরা বিনা যুদ্ধে বাবর কে রাজ্য ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। ভারতে রাজ্য স্থাপন পরিকল্পনা সফল করতে বাবরকে একের পর এক নানা বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়। তিনটি প্রধান যুদ্ধে সাফল্য অর্জন করার পর বাবরের স্বপ্ন সফল হয়। এই তিনটি যুদ্ধ হলো পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ, ঘর্ঘরার যুদ্ধ।

সম্রাট বাবরের লিখিত গ্রন্থের নাম বাবরনামা (চাঘতাই/পার্শি بابر نامہ‎;´, আক্ষরিক অর্থ ‘বাবরের লেখা’ বা ‘বাবরের বই’) হল ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির-উদ্দিন মুহম্মদ বাবরের (১৪৮৩-১৫৩০) লেখা আত্মজীবনী। চাঘতাই ভাষায় রচিত এই বইটি তুজুক-ই-বাবরি নামেও যথেষ্ট পরিচিত।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ:

 লোদী সুলতানের সাথে আফগান আমীরদের বিবাদের ফলে দৌলত খাঁ লোদী ও আলম খাঁ লোদী বাবরকে দিল্লি আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। দৌলত খাঁ ও সুলতানের নিকটাত্মীয় আলম খাঁ ভেবেছিলেন যে, তারা ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে বাবরকে ব্যবহার করে নিজেদের উচ্চাশা পূরণ করবেন। অপরদিকে বাবর ভারতে স্থায়ী আধিপত্য স্থাপনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। বাবর ১৫২৪ সালে লাহোর ও দীপালপুর অধিকার করেন। লাহোর দখলের পর দৌলতখান কে লাহোরের সিংহাসনে বসান। কিন্তু পরবর্তীতে দৌলত খান ও আলম খান একজোট হয়ে বাবর এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। বাবর ১৫২৫ সালে হিন্দুস্তান জয়ের জন্য যাত্রা করলে দৌলত খাঁ বাবরের বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। বাবর পাঞ্জাব জয় করে দিল্লির দিকে এগিয়ে যান। ইব্রাহিম লোদী তাকে পানিপথের প্রান্তরে বাধা দিলে ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

প্রথম যুদ্ধের ঘটনাবলী: 

সম্রাট বাবর তার আত্মজীবনীতে বলেছেন যে তার হাতে মাত্র ১২ হাজার সেনা ছিল। ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে ১ লক্ষ সেনা ছিল বলে জানা যায়।

তবে গবেষকদের মতে প্রকৃতপক্ষে ইব্রাহিমের ৪০,০০০ সেনা ছিল। বাবর ইব্রাহিম এর বিরাট বাহিনীর সম্মুখীন হয়ে হতাশ হওয়ার পরিবর্তে উজবেগী ও তুর্কীদের কাছ থেকে শেখা “তুলঘুমা” যুদ্ধরীতিতে যুদ্ধ করেন। ১)নতুন ব্যূহ গঠন, ২) আগ্নেয়াস্ত্র, কামান ও বন্দুকের উপযুক্ত ব্যবহার, ৩) উজবেগী অশ্বারোহীদের দ্বারা আক্রমণ, এই তিন কৌশলে বাবর পানিপথে ইব্রাহিমের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং ইব্রাহিম যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন। পানিপথের জয়ের ফলে দিল্লি ও আগ্রার দরজা বাবরের কাছে খুলে যায়। ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ স্থাপিত হয়। বাবরের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। বাবরের আগ্নেয়াস্ত্রের সম্মুখে ভারতীয় বাহিনী যুদ্ধজয়ে অক্ষম এ কথা বুঝা যায়।

সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন ও রীতিনীতি

খানুয়ার যুদ্ধ: 

আফগান সামরিক নেতারা ও রাজপুত বীর মহারানা সঙ্গ (রানা সংগ্রাম সিংহ) ছিলেন সম্রাট বাবর এর সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে প্রধান অন্তরায়। পানিপথের যুদ্ধের পরে রানা সিংহের সাথে বাবরের সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। রানা সংগ্রাম সিংহ ইব্রাহিম লোদীর চেয়ে অনেক শক্তিশালী ছিলেন। ১৫২৭ সালের ১৭ মার্চ আগ্রার অদূরবর্তী খানুয়ার প্রান্তরে রানা সংগ্রাম সিংহের নেতৃত্বে ধনুগড়ের উদয় সিংহ, মারাবারের ভীম সিংহ, চান্দেরীর মেদিনীরা, মেওয়াটের হাসান খান ও অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের সমন্বয়ে গঠিত সামরিক মৈত্রী জোট মুঘল বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে মিলিত হয়। বিশাল রাজপুত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে মুঘল বাহিনী ইতস্তত করলে বাবর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মত এক অনলবর্ষী ও তেজোদীপ্ত ভাষণ দিয়ে তার ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীকে অগ্নিমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেন।

মুগল গোলন্দাজ বাহিনীর ক্ষিপ্ত আক্রমণ ও কামানের গোলার আঘাতে শক্তিশালী রাজপুত বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। প্রায় ১০ ঘণ্টার যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব দেখালেও শেষ পর্যন্ত রাজপুত শক্তির পরাজয় ঘটে। পানিপথের যুদ্ধ অপেক্ষা এ যুদ্ধ ছিল নিঃসন্দেহে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। কেননা পানিপথের যুদ্ধে দিল্লির নামমাত্র সুলতান ইব্রাহিম লোদীর পরাজয় ঘটেছিল। কিন্তু খানুয়ার যুদ্ধে ভারতের শক্তিশালী রাজপুত সংঘের পরাজয় ঘটে এবং ভারতে রাজপুত প্রাধান্য স্থাপনের আশা চিরতরে বিনষ্ট হয়।

জি.এন.শর্মার মতে, “সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তারকারী খানুয়ার যুদ্ধের ফলে ভারতের সার্বভৌম ক্ষমতা রাজপুত দের হাত থেকে মোগলদের কাছে স্থানান্তরিত হয় এবং মোগলরা তা ২০০ বছর অধিকারে রাখতে সমর্থ হয়”।

কে.কে. দত্ত বলেন, “খানুয়ার যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী যুদ্ধ ছিল।”

গোগরার যুদ্ধ:

 খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুত শক্তিকে পরাস্ত করার পর বাবর দুর্ধর্ষ আফগান দলপতিদের দমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত ইব্রাহিম লোদীর ভ্রাতা জৌনপুরের শাসনকর্তা মাহমুদ লোদী, বিহারের শের খান বাবরের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গঠন করেন। বাবর নিজ পুত্র আসকারীকে পাঠিয়ে স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করেন। পাটনার সন্নিকটে গোগরা নদীর তীরে বাংলা ও বিহারের আফগানদের সম্মিলিত বাহিনী বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। মাহমুদ লোদী ও শের খানের বাহিনী সম্মিলিত ভাবে মুঘল অগ্রাভিযান মোকাবেলায় ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায় হতাশ মাহমুদ লোদী বাংলার সুলতান নসরত শাহের শরণাপন্ন হন।

কিন্তু ১৫২৯ সালের ৬ ই মে পাটনার নিকটবর্তী গোগরা নদীর তীরে এক ভীষণ যুদ্ধে বাবর নুসরাত শাহের সম্মিলিত বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করলে আফগানদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে গোগরার যুদ্ধের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কেননা ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ এবং ১৫২৭ সালের খানুয়ার যুদ্ধের পর ১৫২৯ সালের গোগরার যুদ্ধ পরিপূরক যুদ্ধ হিসেবে সমধিক পরিচিত। এই যুদ্ধ ছিল বাবরের বর্ণাঢ্য জীবনে সর্বশেষ বৃহৎ যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে আফগানদের পুন:সংগঠিত হওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা চিরতরে বিনষ্ট হয়। অন্যদিকে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের ওপর সম্রাট বাবর তথা মোগলদের আধিপত্য নিশ্চিত হয়।

কৃতিত্ব মূল্যায়ন: 

আধুনিক ও সমসাময়িক ঐতিহাসিকরা বাবরকে মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট বলে অভিহিত করেন। ভিন্সেন্ট স্মিথ, হগভেল, রসব্রুক উইলিয়ামস, ডেনিসন রস প্রমুখ ঐতিহাসিকরা উচ্ছ্বসিত ভাষায় তার প্রশংসা করেছেন। বাবরের সামরিক প্রতিভা, রাজনৈতিক দূর দৃষ্টি, বিদ্যা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ প্রভৃতি তার চরিত্রের দিকগুলো প্রশংসা না করে উপায় নাই। তিনি  তৈমুর এবং চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিবর্তে একটি সাম্রাজ্য স্থাপনের পরিকল্পনা করেন তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

2 thoughts on “সম্রাট বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং তার কৃতিত্ব”

Leave a Comment

Exit mobile version