রেনেসাঁ কী? রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য বা প্রভাব সমূহ আলোচনা কর।

ইউরোপের ইতিহাসে ১৪৫৩ সালের পরবর্তী সময় কে আধুনিক যুগ বলা হয়। তুর্কিদের হাতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের পতন হলে সেখানকার পণ্ডিতরা ইউরোপে চলে আসেন। এভাবেই ইউরোপে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ইতালির ফ্লোরেন্সে সর্বপ্রথম রেনেসাঁসের সূত্রপাত হয়। রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলোঃ

রেনেসাঁ কীঃ

ফরাসি শব্দ Renaissance, ইতালীয় শব্দ Rinascimento শব্দের অর্থ পুনর্জন্ম বা পুনর্জাগরণ বা নবজাগরণ। ফরাসি ঐতিহাসিক মিশেলে ১৮৫৫ সালে রেনেসাঁস শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। মূলত এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাজ পরিবর্তন প্রক্রিয়া। রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগের অবসান ঘটে। এর ফলে মানুষ মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা, রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে আসে। স্বৈরাচারী ও ঈশ্বর প্রদত্ত রাজতন্ত্রের স্থলে আধুনিক রাজনৈতিক জীবন ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের বিবেক বুদ্ধি জাগ্রত হয়। যুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, মুক্ত চিন্তা, উদারতা তথা মানুষ গতিশীল পরিবর্তনের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়। মানুষ নিজের ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র বাইবেল পাঠ করতে সক্ষম হয়। বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করে। পুরনো সংস্কার-কুসংস্কার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ, চিন্তা-চেতনার আলোকে জীবন হয়ে ওঠে গতিময়।

রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্যঃ

১) অন্ধকারাচ্ছন্ন মধ্যযুগ হতে আধুনিক যুগে উত্তরণঃ ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের ধারাকে প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক এই তিন ভাগে ভাগ করেন। মধ্যযুগের ইউরোপের ভাবধারা ছিল চেষ্ট ধর্মবিশ্বাস কেন্দ্রিক, সামাজিক অবস্থা ছিল সামন্ততান্ত্রিক। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ছিল শৃঙ্খলিত এবং বিজ্ঞান চর্চা ছিল উপেক্ষিত। যাজকরা মানুষকে কুসংস্কারে আবদ্ধ করে রেখেছিল। রেনেসাঁ মানুষকে এই স্থবির অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়। শিক্ষার বিকাশ, মানবতাবাদীদের প্রভাব, দার্শনিক আদর্শ, মুদ্রা অর্থনীতির বিকাশ প্রভৃতি আধুনিক যুগের সূচনায় সহায়ক ছিল।

২) গোঁড়ামিপূর্ণ চিন্তা থেকে যুক্তিবাদে উত্তরণঃ পঞ্চদশ শতকে সংঘটিত রেনেসাঁস মানুষের চিন্তা চেতনাকে প্রচলিত গোঁড়ামিপূর্ণতা থেকে যুক্তিবাদে তুলে ধরে। যুক্তিবাদের মূলকথা হলো যেকোনো বিষয়কে প্রশ্নের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করে তার উত্তর অনুসন্ধান করা। মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে ব্যাপক বই রচনা সম্ভব হয়। বাইবেল অনুবাদ করার ফলে মানুষ ধর্মের স্বরূপ সম্পর্কে জানতে পারে। বিভিন্ন দার্শনিক, চিন্তাবিদের বই পড়ে মানুষ যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে।

৩) একচেটিয়া ধর্মান্ধতা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতায় উত্তরণঃ মধ্যযুগে ধর্মীয় কোন স্বাধীনতা ছিল না।মানুষের মন ও চেতনা আবর্তিত হতো ধর্ম ও বাইবেলকে ঘিরে। বাইবেলে নেই এমন কিছু সমাজে গৃহীত হতো না।  আর ধর্মের সর্বময় কর্তা ছিলেন পোপ এবং তাঁর অধীনস্থ গুরুগণ। তাদের কঠোর অনুশাসন ও অত্যাচারকে মানুষ নিয়তি বলে মেনে নিত। সাধারণের মধ্যে ধারণা ছিল যে, যাজকের অনুভূতি ছাড়া ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব নয়। কিন্তু রেনেসাঁস ধর্মের যুক্তিবাদিতা, উদারতা, নির্ভীকতা, পরম সহিংসতার বিশ্বাস এবং ধর্ম বিষয়ে স্বাধীন চিন্তার সুযোগ এনে দেয়। ধর্মীয় স্বাধীনতার সুযোগের মাধ্যমেই পরধর্ম সহিংসতার সৃষ্টি হয়। যাজকের কোন অনুগ্রহ ছাড়াও ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ সম্ভব এটি সকলের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে। সমাজ থেকে ধর্মান্ধতা বিতাড়িত হওয়ার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা সৃষ্টি হয়।

৪) প্রাচীন শিক্ষা-সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারঃ মধ্যযুগে গ্রিক ও রােমান সাহিত্য-দর্শন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। যুক্তিবাদের স্থলে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার সমগ্র ইউরােপকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। গির্জার প্রভাবে মানুষ ইহকাল অপেক্ষা পরলােকের চিন্তায় ভীত হয়ে ওঠে।  পঞ্চদশ শতকে রেনেসাঁসের প্রভাবে মানুষ মধ্যযুগে অবলুপ্ত গ্রিক ও রােমান সাহিত্য-দর্শনের প্রতি প্রবল আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাদের স্বাধীনতার সহিত দিনাতিপাত ও যুক্তিবাদ সম্পর্কে মানুষ জানতে পারে। মধ্যযুগে প্রাকৃতিক জগৎ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছু চিন্তা করা ধর্মবিরুদ্ধ ছিল। নবজাগরণ প্রাকৃতিক জগৎ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈজ্ঞানিক সত্য সম্পর্কে মানুষকে শ্রদ্ধাশীল করে তােলে। রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য

৫) ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ হতে জাতীয় রাষ্ট্রে উত্তরণঃ মধ্যযুগে জাতীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিলনা। সামন্তগণ নিজ নিজ এলাকায় একেক জন ক্ষুদ্র রাজা ছিলেন। প্রত্যেক ক্রিস্টান ধর্মালম্বী পবিত্র রোমান সম্রাটের প্রজা ছিলেন। ইউরোপের স্থানীয় রাজারা পবিত্র রোমান সম্রাটের নামে বা তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করত। মধ্যযুগের শেষ দিকে পবিত্র রোমান সম্রাট ও পোপের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেখা দিলে রাজশক্তিগুলো পোপের বিরুদ্ধে প্রকে দাঁড়ায়। আগ্নেয়াস্ত্র আবিষ্কৃত হলে সামন্তদের দমন করা সম্ভব হয়। এভাবে ফ্রান্স, স্পেন ও ইংল্যান্ডে শক্তিশালী রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং জাতিরাষ্ট্র আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

৬) সামন্তবাদ হতে বাণিজ্যবাদে উত্তরণঃ মধ্যযুগের ইউরোপে সামন্তবাদী অর্থনীতি প্রচলিত ছিল। এ ব্যবস্থায় সকলের উপরে রাজা, এরপর জমিদার শ্রেণী এবং সর্বনিম্ন স্তরে ছিল সার্ফ বা ভূমিদাস। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে সামন্তবাদ দুর্বল হয়ে পড়লে বণিকরা স্বাধীনভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করার সুযোগ পায়। এসময় দক্ষিণ ইতালিকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন বাণিজ্যিক অর্থনীতির জন্ম নেয়। এভাবে ইউরোপে সামন্তবাদের স্থলে বাণিজ্যবাদের উদ্ভব ঘটে। একই সাথে ভূমিদাস প্রথার অবসান ঘটে এবং স্বাধীন কৃষক সমাজের উদ্ভব ঘটে।

৭) ব্যক্তিত্বের বিকাশঃ মধ্যযুগীয় ব্যক্তি সমাজে ছিল কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলা। আচার-আচরণ এবং রীতিনীতির দ্বারা শৃঙ্খলিত ছিল। কৃষক, ভূমি মালিকের আদেশাধীন ছিল। শিল্পকার ও কারিগর শিল্প ও কারিগরি সংঘের কঠিন নিয়মে আবদ্ধ ছিল। ক্যাথলিক চার্চ ব্যক্তির ধর্ম, ব্যক্তিগত জীবন ও চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণ করত। মধ্যযুগের শেষ দিকে ব্যক্তি নিজ চেষ্টার ফলে শৃংখল হতে মুক্তি লাভ করে এবং স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশ এর সুযোগ পায়। ব্যক্তির মুক্তির মাধ্যমে আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য

৮) ধর্ম সংস্কার আন্দোলনঃ রেনেসাঁসের ফলে মানুষের মনে অনুসন্ধিতসার সৃষ্টি হলে যাজক শ্রেণীর ধর্মহীনতা, কুসংস্কার ও ক্যাথলিক চার্চের বিভিন্ন ত্রুটি মানুষের চোখে ধরা পড়ে। ধর্মকে সঠিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ধর্ম সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। উল্লেখ্য যে, ধর্মসংস্কার আন্দোলন প্রথম শুরু হয় ১৫১৭ সালে ইউরোপীয় দেশ জার্মানিতে মার্টিন লুথার এর আন্দোলনের মাধ্যমে। ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের (Reformation movement) ফলে ইংল্যান্ডে অ্যাংলিকান চার্চ, স্কটল্যান্ডে প্রেসব্যাটেরিয়ান চার্চ, সুইজারল্যান্ড এ জুইংলি ও ক্যালভিনের নেতৃত্বে প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিজের ইচ্ছামত যে কোন ধর্ম গ্রহণের স্বীকৃতি লাভ করে। ধর্মসংস্কার আন্দোলন থেকেই প্রতিসংস্কার আন্দোলনের (The counter Reformation movement) সূচনা হয় এবং এর ফলে ক্যাথলিক চার্চের দুর্নীতি ও কুসংস্কার অনেকটা দূরীভূত হয়। 1555 সালে অগসবার্গের সন্ধির মাধ্যমে ধর্ম সমস্যার সমাধান হলে মানুষ ধর্মীয় শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে।

৯) ভৌগোলিক আবিষ্কারঃ ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে মানুষের ভৌগলিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটে এবং আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। নতুনদেশ ও বাণিজ্যপথ আবিষ্কারের ফলে ইউরোপের সমৃদ্ধ সমুদ্র বাণিজ্য মহাসাগর বাণিজ্যে পরিণত হয় এবং আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি গঠিত হয়। ভৌগলিক আবিষ্কার এর ফলে ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলো শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলে এবং সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া আধুনিক ব্যাংকিং, যৌথ কারবার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আধুনিক সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফল।

১০) ভূমিদাস হতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশঃ মধ্যযুগের ইউরোপে যাজক, অভিজাত এবং সাধারণ মানুষ এই তিন শ্রেণী ছিল। সমাজের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করত যাজক এবং অভিজাতরা। মধ্যযুগের শেষে এবং আধুনিক যুগের শুরুতে তৃতীয় শ্রেণি থেকে ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক এবং কারিগর শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী শহরে বসবাস করত। তারা ইউরোপে আধুনিক ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং বিভিন্ন কারখানা স্থাপন করে। তাঁরাই আধুনিক পুঁজিবাদের জন্ম দেয়। রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য

১১) পুঁজিবাদী অর্থনীতিঃ ধর্মসংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সূচনা হয়। যা আধুনিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ক্যাথলিক ধর্মে সুদকে নিরুৎসাহিত করা হতো কিন্তু প্রোটেস্ট্যান্টরা পুঁজিবাদ এবং ধন-সম্পদকে মঙ্গলকর মনে করত। মুদ্রা অর্থনীতি প্রচলিত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। শিল্প-কারখানা স্থাপন করে দূর দেশে বাণিজ্য চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর অর্থ বা পুঁজির। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ইউরোপের সমাজ, ধর্ম, রাজনীতিতে নতুন ভাবধারার জন্ম দেয়। এসময় ইতালির ফ্লোরেন্স এবং জেনোয়া ইউরোপের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল।

১২) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপলব্ধিঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপলব্ধি তো দূরের কথা তার চিন্তা করাও ছিল ধর্মবিরুদ্ধ এবং মহাপাপ। রেনেসাঁসের ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপলব্ধি করার এবং যা কিছু ভাল তা গ্রহণ করার মনোবৃত্তি সৃষ্টি হয়। সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন সর্বক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনুভূতির প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। এর ফলে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির উন্নতি সাধিত হয়।

রেনেসাঁস যুগের শিল্পীঃ রেনেসাঁর জনক ছিলেন বিখ্যাত শিল্পীদের একটি দল।  আর শিল্পীরা হলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, ডোনাটে -লো বার্দি রাফায়েল, সানজিও দা উরবিনো এবং মাইকেলেঞ্জেলো বুওনারোতি। রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য

Leave a Comment