ফিনিশীয়দের পরিচিতিঃ ফিনিশীয় সভ্যতার অবদান

ফিনিশীয়দের পরিচিতি ও উত্থান: 

সর্বপ্রথম ফিনিশিয়া শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব আট শতকে গ্রিক মহাকবি হোমারের লেখায়। গ্রিক শব্দ phoenix থেকে ফিনিশিয়া নামের উৎপত্তি। এর অর্থ purple বা বেগুনি রং। বস্ত্র রাঙানোর জন্য প্রাচীন ভূমধ্যসাগরের বিশেষ খোলস যুক্ত মাছের শরীর থেকে বেগুনি রং সংগ্রহ করা হতো। ফিনিশীয় সভ্যতার অবদান বর্ণনা করা হলঃ

এ সংগ্রহের সাথে ফিনিশীয়রা জড়িত ছিল বলে গ্রীকরা তাদের বলতো ‘বেগুনি বর্ণের মানুষ’। পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগরীয় ভূখণ্ডের সিরিয়ায় বসবাস করা সেমিটিক গোষ্ঠীভুক্ত কেনানাইটরা ফিনিশিয়া বলে খ্যাত হয়।ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব 3000 অব্দে উত্তর মেসোপটেমিয়া থেকে সেমিটিক গোষ্ঠীভুক্ত একদল যাযাবর লেবাননের পর্বতমালা ও ভূমধ্য সাগরের উপকূলে বসতি গড়ে তোলে। ক্রমান্বয়ে তারা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল ও মরুভূমির পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

ভূমধ্যসাগরীয় পূর্বাঞ্চলে কৃষি জমির পরিমাণ কম হওয়ায় জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা সমুদ্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে পোতাশ্রয়, বড় বড় জাহাজ ও বন্দর নির্মাণ করে। সমুদ্রপথে ক্রিট, মাইসেনীয় এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নগরগুলো সাথে এবং সড়কপথের মিশর থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত যোগাযোগ গড়ে তোলে। ফিনিশীয়রা পৃথিবীর ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক সভ্যতা গড়ে তোলে।

সভ্যতার ইতিহাসে ফিনিশীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান হল বর্ণমালা (Alphabet) এর উদ্ভাবন। তারা ২২ টি ব্যঞ্জনবর্ণের (Consonants) উদ্ভাবন করে। আধুনিক বর্ণমালার সূচনা হয় এখান থেকে। ফিনিশীয়দের উদ্ভাবিত বর্ণমালার সাথে পরবর্তীতে গ্রিকরা স্বরবর্ণ (Vowels) যােগ করে বর্ণমালাকে সম্পূর্ণ করে।
ফিনিশীয়দের বাণিজ্য শুরুর পটভূমি: 

২৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই ফিনিশীয়দের সাথে মিশরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৫৫০-১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এর মধ্যে কেনান (প্যালেস্টাইন) ও ফিনিশিয়া নিয়ে মিশরের একটি প্রদেশ গঠিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে হিট্টাইটদের পতন, মিশরের কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা, ক্রিটের রাজনৈতিক পতন, শক্তিহীন ব্যাবিলনিয় শাসনের সুযোগে ফিনিশীয়রা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যদিও তারা সমৃদ্ধ রাজনৈতিক কাঠামো ও সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হচ্ছে ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এর মধ্যে সিডন, টায়ার, আরাদুস, বাইব্রোসকে কেন্দ্র করে ফিনিশীয়রা মিশর, এশিয়া মাইনর, বলকান উপদ্বীপ, ইতালি ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলে।

ফিনিশীয় উপনিবেশ: 

ইতিহাসে ফিনিশীয়রাই প্রথম অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে সার্থক উপনিবেশিক ধারণার জন্ম দেয়। এসেরীয় আক্রমণের আগেই তারা ভূমধ্যসাগরীয় বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপনিবেশের সংখ্যা ছিল ৫০টি। সবচেয়ে বড় উপনিবেশ ছিল আফ্রিকার উত্তর উপকূলের কার্থেজ।

ফিনিশীয় প্রশাসন: 

ফিনিশীয়রা ছিল ব্যবসায়ী জাতি। ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ফিনিশীয় রাজনীতি ছিল অনেকটা কনফেডারেশন ধরনের। শুরুর দিকে তারা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও পরবর্তীতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্র ও উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে তারা তাদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে স্বাধীনভাবে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাদের প্রত্যেক শহরের আলাদা প্রতিরক্ষা, সৈন্য ও নৌবহর ছিল। অ্যারিস্টটল মনে করেন, সমস্ত ক্ষমতা পরিচালিত হতো দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট এর মাধ্যমে। ফিনিশীয়রা প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার এর চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল।

গ্রিক সভ্যতার উদ্ভব ও গ্রিকদের অবদান এবং এথেন্স ও স্পার্টা।

ফিনিশীয় অর্থনীতি: 

ফিনিশীয়দের প্রাথমিক জীবিকা ছিল কৃষি ও পশুপালন। পাহাড় ও সমতল উপত্যকায় বিভিন্ন ধরনের শস্য দানা, আঙ্গুর, জলপাই ও খেজুরের চাষ হতো। এগুলো চাষে কৃত্রিম জলসেচের সাহায্য নেওয়া হতো। পশুর মধ্যে গাধা, ছাগল ও ভেড়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষিভূমি কম থাকায় একদিকে তারা বহির্বাণিজ্য ও উপনিবেশ গড়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। অন্যদিকে ফিনিশীয় নগরগুলোতে বিভিন্ন শিল্পজাত দ্রব্য তৈরীর উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে।

ফিনিশীয়দের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড: 

ব্যবসা-বাণিজ্য, জাহাজ নির্মাণ, কারিগরি দক্ষতা বা কারুশিল্প, সুগন্ধি দ্রব্য, রং তৈরি সহ আরও নানাবিধ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সাথে ফিনিশীয়দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

নৌকা নির্মাণ: 

প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম নাবিক ও জাহাজ নির্মাতা হিসেবে ফিনিশীয়দের খ্যাতি ছিল প্রচুর। নৌ বাণিজ্য কে কেন্দ্র করে তাদের মূল উপাদান সমূহ জড়িয়ে আছে। তাদের বাসভূমি লেবাননে সিডার গাছের বন ছিল। গাছ কেটে নৌকা বানানো তাদের জন্য সহজবোধ্য কাজ ছিল। তারা দুই ধরনের জাহাজ নির্মাণ করত। বাণিজ্যিক কারণে অনেকটা গোল জাহাজ এবং যুদ্ধের জন্য লম্বা জাহাজ। এছাড়া মাছ ধরার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৌকা নির্মাণ করতো। জাহাজ নির্মাণে তাদের অপরিসীম প্রাধান্যের ফলে তারা সমুদ্র বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

ব্যবসা-বাণিজ্য: 

মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের  তাদের উপনিবেশের সূচনা হয় এবং উপনিবেশ স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হয়। সমুদ্র ও স্থল বাণিজ্যে তাদের আধিপত্য এর ফলে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে তারা সাফল্য লাভ করেছিল। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী তারা বাণিজ্যের পণ্য নির্ধারণ করত। রাতের সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য তারা ধ্রুবতারা লক্ষ্য করে যাতায়াত করতো। তারা জিব্রাল্টার, আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে আফ্রিকায় পৌছেছিল।

তারা আফ্রিকা থেকে সোনা, হাতির দাঁত, উট পাখির পালক এবং আরব দেশ থেকে সুগন্ধি দ্রব্য ও মসলা আমদানি করত। স্পেন থেকে স্বর্ণ, রৌপ্য ও টিন সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করতো। তারা ভুমধ্যসাগরের ধনী অঞ্চলে কাচ, কাচ দ্রব্যাদি, হাতির দাঁত, আসবাবপত্র, ব্রোঞ্জের অলংকার এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করতো।

এছাড়া ভূমধ্যসাগর থেকে আহরিত বিশেষ খোলসযুক্ত মাছ থেকে তৈরি বেগুনি রং, বিভিন্ন রকম চকচকে মনি, জহরত ও অলংকার তাদের বাণিজ্য তালিকায় ছিল। রজার্স ও অ্যাডামস এর মতে কৃষ্ণ সাগর এলাকা থেকে সড়কপথে দাস ও ঘোড়ার ব্যবসা প্রচলিত ছিল। চীনের সাথে ভূমধ্যসাগর এলাকায় সিল্কের বস্ত্রের ব্যবসা ছিল। মিশরের সাথে ফিনিশীয়দের কাপড়ের বাণিজ্য হত।

ফিনিশীয়দের কারিগরি দক্ষতা: 

ফিনিশীয়রা মাটির পাত্র তৈরি করতে পারত। দক্ষতার সাথে কাপড় তৈরি ও রং করতে পারত। নকশাকাটা ধাতব দ্রব্য তারা তৈরি করত। গ্রিক কবি হোমারের লেখা ফিনিশীয়দের তৈরি পোশাক সোনার অলংকারের কথা রয়েছে। তারা এসেরীয় রাজপ্রাসাদের আসবাবপত্র তৈরি করে দিয়েছিল। তারা জেরুজালেম মন্দির তৈরি করেছিল।

ফিনিশীয়দের সাংস্কৃতিক জগতে অবদান: 

ফিনিশীয় নাবিকরা তারা দেখে জাহাজ চালাত। ধ্রুবতারা দেখে তারা দিক নির্ণয় করত। এ কারণে ধ্রুবতারাকে আগে অনেকে ফিনিশীয় তারা বলত। সভ্যতার ইতিহাসে ফিনিশীয়দের বড় অবদান হল বর্ণমালার উদ্ভাবন। তারা ২২ টি ব্যঞ্জনবর্ণ উদ্ভাবন করে। আধুনিক বর্ণমালা এর সূচনা এখান থেকেই হয়েছিল।

ফিনিশীয়দের রাজনৈতিক ইতিহাস: 

ফিনিশীয়রা রাজনৈতিক কাঠামো এর চেয়ে বাণিজ্যিক প্রতিপত্তি তৈরীর প্রতি বেশ মনোযোগী ছিল। তবুও মিশর, এশিয়া মাইনর, বলকান অঞ্চল ও পশ্চিম মধ্য সাগরীয় অঞ্চলের তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব এর প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৯৭০ সালের দিকে সলোমান ক্ষমতায় এলে দক্ষিণের শহর গুলো ফেরত পায় ফিনিশীয়রা। হিরাম ও সলোমানের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হওয়ায় হিব্রু ও ফিনিশীয়দের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সলোমানের পরেও ফিনিশীয়দের সাথে হিব্রুদের সম্পর্ক ভালো ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব ৮৭৬ সালে তাদের শান্তি উৎখাত করেন এসেরীয় রাজা দ্বিতীয় আসুরবানিপাল। ফিনিশীয় অঞ্চলগুলো বাধ্য করে দিতে। এরপর সুদীর্ঘ সময় ধরে ফিনিশীয়রা এসেরীয়দের, ক্যালডীয়দের এবং গ্রিকদের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বীর আলেকজান্ডার টায়ার অভিযান চালিয়ে ফিনিশীয়দের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেন।

সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন কোথায় পাওয়া গেছে? সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার, জন্ম, খননকার্য, সময়কাল এবং পতন

ফিনিশীয়দের সফলতা ও ব্যর্থতা: 

ফিনিশীয়রা সফল ব্যবসায়ী ছিল। তারাই পৃথিবীর ইতিহাসে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক সভ্যতা গড়ে তোলে। তারা বাণিজ্যের প্রয়োজনে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। তারাই ব্যঞ্জনবর্ণ উদ্ভাবন করেছিল। তবে ফিনিশীয়রা সম্রাজ্য সম্প্রসারনের চেয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়ায় তাদের কোনো শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছিলনা। ফলে তারা এসেরীয়দের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি।

ব্লগ লেখকঃ সাজ্জাদ তালুকদার

1 thought on “ফিনিশীয়দের পরিচিতিঃ ফিনিশীয় সভ্যতার অবদান”

Leave a Comment

Exit mobile version