জার্মানিতে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন হওয়ার কারণ ও ফলাফল (1517)

ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্ম সংস্কারের জন্য যে আন্দোলন হয় ইতিহাসে তা ধর্ম সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত। পোপ নিয়ন্ত্রিত মধ্যযুগের চার্চগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্যই মূলত ১৫১৭ সালে জার্মানিতে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর (Reformation movement) সূত্রপাত হয়। ধর্মীয় সংস্কার চালাও এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল। ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে জার্মানির মার্টিন লুথার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর প্রকৃতি:

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর প্রকৃতি ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয়ই।

১) ক্রিস্টান জগতের নৈতিক শুদ্ধতা এবং পোপের ধর্মীয় আধিপত্য অগ্রাহ্য করে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা। ২) পোপের আধিপত্য উচ্ছেদ করে অভ্যন্তরীণ ও ধর্মের ক্ষেত্রে রাজ শক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। পোপের আধিপত্যের কারণে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে যায়। পোপের আধিপত্য বিলোপ করে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন কায়েম করা হয়।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর কারণ:

মানবতাবাদীদের (Humanist) প্রভাব: ক্যাথলিক চার্চের পোপ গণ তাদের ধর্মীয় দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রভুত্ব স্থাপনের জন্য যুদ্ধ ও শত্রুতায় লিপ্ত হয়। ফলে পোপদের দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে। এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক যুগের ইউরোপে ইতালীয় শহর ফ্লোরেন্সের স্যাভোনারোলা (1452-1498), হল্যান্ডের ডেসিডেরিয়াস ইরাসমাস (1466-1536), ইংল্যান্ডের জন ওয়াইক্লিফ (1224-1384), স্যার থমাস মোর (1478-1535), জন রিউক্লিন (1455-1522), জন কোলেট, জার্মানির মার্টিন লুথার (1483-1546), সুইজারল্যান্ডের হারলিখ জুইংলি (1484-1581), ফ্রান্সের জন ক্যালভিন (1509-1564), হাঙ্গেরির বোহেমিয়ার জন হাস (1369-1415) প্রমুখ প্রখ্যাত ধর্মজ্ঞানী ও মানবতাবাদী পন্ডিত ক্যাথলিক ধর্ম সংস্কারের দাবি তোলেন।

পোপ, যাজক ও চার্চের দুর্নীতি: মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপের ক্যাথলিক চার্চ কুসংস্কার, ভন্ডামি, জাঁকজমক ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রভৃতি লালন করত। মানুষের বিপদ ও আত্মার মুক্তির জন্য বিভিন্ন সাধুদের শরণাপন্ন হত এবং জনগণের ধর্মীয় ও কুসংস্কারের সুযোগ নিয়ে যাজকরা মানুষকে শোষণ করতো। পোপ যাজক নিয়োগে দুর্নীতি করত। পোপ ও বিশপরা রাজাদের মতো জীবনযাপন করতো। যাজকদের বিয়ে নিষিদ্ধ থাকলেও তারা গোপনে রক্ষিতা পোষণ করতো। পোপ ও বিশপদের অবৈধ সন্তান ছিল। নিচু স্তরের যাজকরা শুঁড়িখানা, জুয়ার আসর সহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিল। এছাড়া ক্যাথলিক চার্চ বিভিন্নভাবে যেমন পবিত্র বস্তু প্রদর্শন করে ধর্মবিশ্বাসীদের নিকট থেকে অর্থ উপার্জন করতো।

রেনেসাঁ কী? রেনেসাঁর বৈশিষ্ট্য বা প্রভাব সমূহ আলোচনা কর।

ইন্ডালজেন্স বিক্রি: ক্যাথলিক চার্চ ইন্ডালজেন্স (Indulgence) নামক পোপের মুক্তিপত্র বিক্রয় করে প্রচুর অর্থ আদায় করত। পাপ মুক্তির এই সনদ দিয়ে পোপ কারো পাপ কমিয়ে দিতে পারতেন বলে প্রচার করা হয়। ফলে মানুষ তাদের অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে পোপ ও যাজকদের নিকট হতে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ইন্ডালজেন্স ক্রয় করতো। ক্রমে এটি অর্থোপার্জনের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। তখন পোপ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানকে কমিশন প্রদানের মাধ্যমে ইন্ডালজেন্স বিক্রির অনুমোদন দেন।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর আদর্শগত কারণ: খ্রিস্ট জগতে সেন্ট অগাস্টিনের দর্শন এবং সেন্ট একুইনাসের দর্শন একসাথে প্রচলিত ছিল। সেন্ট অগাস্টিন বিশ্বাস করতেন, জগতের সকল ঘটনা ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত। ঈশ্বরের দয়া ছাড়া মানুষের মুক্তির জন্য কোন পথ নেই। এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, প্রার্থনা এগুলো মূল্যহীন। সেন্ট একুইনাসের মত ছিল, গির্জা ও সৎকর্ম মানুষের জন্য ঈশ্বরের দয়া লাভে মধ্যস্থতা করতে পারে। সেন্ট অগাস্টিনের দর্শন মার্টিন লুথার ও অন্যান্য সংস্কারকদের প্রভাবিত করেছিল। তারা ক্যাথলিক চার্চ ও যাজকদের কর্মকাণ্ডকে খ্রিষ্টধর্মের বিকৃত রূপ বলে মনে করতেন।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর সমাজতাত্ত্বিক কারণ: মধ্যযুগের শেষে সামন্ততন্ত্রের পতন এর ফলে ইউরোপের মধ্যবিত্ত (ধনীবণিক) শ্রেণীর উদ্ভব, নগরায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, শিল্পায়ন প্রভৃতির ফলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। কিন্তু ক্যাথলিক ধর্মে পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য সুদকে ঘৃণা এবং ধনকে স্বর্গ প্রাপ্তির প্রতিবন্ধক মনে করা হতো। এ অবস্থায় পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা বিকাশের জন্য ক্যাথলিক ধর্ম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে নতুন ভাবধারা হিসেবে সংস্কারকৃত প্রোটেস্ট্যান্টবাদ পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

রাজনৈতিক কারণ: মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপে পোপ ও যাজক শ্রেণী রাজনৈতিক ক্ষমতা দাবি করলে প্রত্যেক দেশের রাজাও রাজতন্ত্রের সমর্থক গণ নিজ নিজ দেশকে রোমান ক্যাথলিক চার্চের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার চেষ্টা শুরু করে। রাজা ও পোপের দ্বন্দ্ব প্রত্যেক দেশে জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি করলে রাজশক্তি ধর্ম সংস্কারকদের সমর্থন দিতে শুরু করে। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে পরিণত হয়।

অর্থনৈতিক কারণ: ক্যাথলিক চার্চ বিভিন্ন উপায় জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত। ধর্মকর, মামলার আপিল বাবদ অর্থ, ফিউডাল কর, তীর্থযাত্রার দক্ষিণা এবং যাজকদের assets, first fruits ইত্যাদি বাবদ অর্থ পোপকে দিতে হতো। পোপের অর্থ শোষণ বন্ধ করার জন্য প্রত্যেক দেশের রাজারা ধর্ম সংস্কারকদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে। এছাড়া জার্মানির তিন ভাগের এক ভাগ জমি, ফ্রান্সের ৫ ভাগের ১ ভাগ জমি, ইংল্যান্ডের অনেক জমি ছিল চার্চ ও মধ্যযুগে ইউরোপে গড়ে ওঠা মঠগুলোর অধীনে। এসকল জমি দখলের জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং রাজশক্তি ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করে।

রেনেসাঁসের প্রভাব: মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে যুক্তিবাদ ও প্রগতিশীল ধ্যান ধারণার সূচনা করেছিল। তা মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে। এমনকি যুক্তিবাদী ধ্যান ধারণার সৃষ্টি করে। ফলে শিক্ষিত ও উদার খ্রীস্ট ধর্ম বিশ্বাসীরা বাইবেলের মূল শিক্ষা পাঠ করে বুঝতে পারে যে, গির্জা পরিচালিত ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান অশিক্ষা বাইবেলের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে তারা ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেয়।

প্রত্যক্ষ কারণ: ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল 1517 সালে জার্মানিতে পোপের indulgence বিক্রি। টেটজেল নামক একজন ডোমিনিকান ফ্রায়ার জার্মানিতে এসে indulgence বিক্রি শুরু করলে উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক মার্টিন লুথার এর চরম প্রতিবাদ করেন। প্রথমে তিনি ক্যাথলিক চার্চের অনাচার ও দুর্নীতি দূর করার জন্য আবেদন জানায়। কিন্তু পোপ দশম লিও এতে কর্ণপাত না করায় মার্টিন লুথার প্রকাশ্যভাবে রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে 95 টি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তার এ প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে 1517 সালে জার্মানিতে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর ফলাফল:

রাজনৈতিক ফলাফল: ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে ইউরোপের অনেক দেশে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম জাতীয় ধর্মে পরিণত হয়। ফলে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের এবং ক্যাথলিক চার্চের জাতীয় ঐক্য নষ্ট হয়। এ আন্দোলনের ফলে ইউরোপের জার্মানি, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন এবং নেদারল্যান্ডস প্রভৃতি দেশ রোমের ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং এ প্রত্যেকটি দেশে জাতীয় গির্জা প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর (Reformation movement) ফলে ইংল্যান্ডে অ্যাংলিকান চার্চ, স্কটল্যান্ডে প্রেসব্যাটেরিয়ান চার্চ, সুইজারল্যান্ড এ জুইংলি ও ক্যালভিনের নেতৃত্বে প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিজের ইচ্ছামত যে কোন ধর্ম গ্রহণের স্বীকৃতি লাভ করে।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলন পোপতন্ত্রকে দুর্বল করে রাজতন্ত্রকে সবল করে। ধর্মকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও দেশাত্মবোধ সৃষ্টি করে। ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পূর্বে রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপরা সহজে যেকোন দেশের রাজাদের সকল ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন । ধর্মসংস্কার আন্দোলন যাজকদের হাত থেকে রাজাদের মুক্তি করে।  রাজারা ক্রমশই রাষ্ট্র ও চার্চের  উপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

Divine Rights of Pope এর স্থলে Divine Rights of King প্রতিষ্ঠিত হয়। Secular চিন্তা বিকাশ লাভ করতে থাকে। যারা পবিত্র রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রতি অনুগত ছিলেন তাদের বলা হতো রোমান ক্যাথলিক । যারা পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে নতুন চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন তাদের বলা হয় প্রোটেস্ট্যান্ট । জার্মানি, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান করে। অপরদিকে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড রোমান ক্যাথলিক ধর্ম ও রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রতি অনুগত থাকে। এ দেশগুলো ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান করে।

ধর্মীয় ফলাফল: ধর্ম সংস্কার আন্দোলন খ্রিস্টান চার্চে বিভক্তির সৃষ্টি করে। চার্চের সর্বজনীনতাকে প্রত্যাখান করে। খ্রিস্টান জগতের এক বৃহৎ অংশ পোপের আনুগত্য থেকে বের হয়ে আসে এবং অন্য দল চার্চের প্রতি আনুগত্যশীল থাকে।  ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের পর খ্রিস্টধর্ম অধিকতর উদার ও যুক্তিবাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে । ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয় গ্রুপ এই যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দানের মাধ্যমে তাদের ধর্মের মূলনীতি ও তথ্যকে বিশ্লেষণ করতে এগিয়ে আসে ।

প্রোটেস্ট্যান্ট নেতারা ছিলেন মনেপ্রাণে মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী । অন্ধত্বের মুক্তি ছিল এদের মূল মন্ত্র । কিছু সুনির্দিষ্ট নৈতিক অনুশাসন দ্বারাে এ মতবাদ পরিচালিত হয় ।মধ্যযুগের ধর্ম বিষয়ে কোন স্বাধীনতা বা ব্যক্তিগত মতামত পোষন করা সম্ভবপর ছিল না । ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে গোঁড়া ক্যাথলিকরাও তাদের গোঁড়ামি থেকে বেরিয়ে আসে । ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইউরোপে আরও একটি ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয় যা প্রতি সংস্কার আন্দোলন নামে পরিচিত । এছাড়া ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে ধর্ম সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা দূর হয়।

অর্থনৈতিক ফলাফল: ক্যাথলিক ধর্মে পুঁজিবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য সুদকে ঘৃণা এবং ধনকে স্বর্গ প্রাপ্তির প্রতিবন্ধক মনে করা হতো। পক্ষান্তরে প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ পুঁজিবাদ ও সুদের পক্ষে ছিল। ফলে ব্যাংকার, বণিক, কারখানা এর মালিক ইত্যাদি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটতে থাকে। ক্যাথলিকরা যেখানে সুদকে পাপ মনে করত প্রোটেস্ট্যান্টরা সেখানে সুদকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত মনে করে। প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মে পরিশ্রম, সঞ্চয়, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতিকে মঙ্গলজনক এবং অলসতাকে পাপ হিসেবে উল্লেখ করায় প্রোটেস্ট্যান্ট দেশগুলোতে পুঁজির বিকাশ হয়।

ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের ফলে চার্চের অধীনস্ত বিশাল সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে চলে আসতে থাকে এবং উন্নয়নমূলক কাজে তা ব্যবহার হতে থাকে। জনগণ যাজক শ্রেণীর শোষণের হাত থেকে রক্ষা পায়। পোপের অর্থ শোষণ বন্ধ হলে ইউরোপের অনেক দেশ আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ হয়। ফলে দ্রুতগতিতে মার্টিন লুথার এর প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মমত প্রচারিত ও প্রসারিত হয়।

সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি রহিতকরণের ইতিহাস।

সামাজিক ফলাফল: ধর্ম সংস্কার আন্দোলন এর ফলে পিউরিটানবাদের উদ্ভব হয়। (পিউরিটান: ইংল্যান্ডে ক্যালভিনবাদ (প্রোটেস্ট্যান্ট) পিউরিটান ধর্মমত হিসেবে পরিচিত ছিল) তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নৈতিক চরিত্রের উন্নতিসাধন। ইনকুইজিশন এর মাধ্যমে চরম শান্তির স্থলে মানবিক শান্তির ব্যবস্থা করা হয় । যাদুবিদ্যার প্রভাব কমতে থাকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। স্কটল্যান্ডে জনলক্স প্রতিটি প্যারিতে একটি পাঠশালা , প্রতিটি মফস্বল শহরে একটি স্কুল, প্রতিটি বড় শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলেন ।

নারীদের সামাজিক শিক্ষার পথ উম্মুক্ত করা হয়।  নারীরা বাইবেল পড়ার অনুমতি পায়। পুরুষ-নারী উভয়েই প্রাথমিক স্কুলে যাওয়ার অনুমতি পায়। ফলে নারী ও পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়তে থাকে। অপরদিকে বাইবেলের বহুল প্রচার ও প্রসারের ফলে সৎও সংযত জীবনের প্রতি আগ্রহ দেখা দেয়। ধর্মীয় জ্ঞান বৃদ্ধির ফলে ন্যায় পরায়নতা বৃদ্ধি পায়। এতে পোপের অনৈতিকতা ও শোষণ নীতির অবসান ঘটে ।

শিল্প ও সাংস্কৃতিক ফলাফল: বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন ধর্মীয় আন্দোলন হলেও বিজ্ঞান, মুক্ত বুদ্ধির চর্চা ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় নানাবিধ প্রভাব রাখে । প্রচলিত বিশ্বাস ও ধর্ম ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করে জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। ভৌগোলিক আবিষ্কার আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং সব কিছুকে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।  বৈজ্ঞানিক তথ্যের উদ্ভাবনের ফলে দর্শনের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন সূচিত হয় ।

ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে ছাড়াও ইতিহাস, ভূগোল, নৈতিকতা, আধুনিক ভাষা শিক্ষা, পদার্থবিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, গণিত ,আইন, সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান চর্চা হতে থাকে । অথচ পূর্বে ধর্মীয় শিক্ষাকে জ্ঞানচর্চার একমাত্র উপায় মনে করা হতো । আগে ইতিহাস লেখা হত সাহিত্যের ঢংয়ে । সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে ইতিহাস লেখার প্রচলন হয় আধুনিক তথ্য ও উপাত্ত যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে । আর শিল্পকলার ক্ষেত্রে পুরনো গথিক রীতির পরিবর্তে বারূক রীতি প্রচলিত হয়, যা স্থাপত্য-শৈলীর নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

NOTES:

>> ইংল্যান্ডের জন ওয়াইক্লিপকে ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের অগ্রদূত এবং শুকতারা বলা হয়।
>> হল্যান্ডের ডেসিডেরিয়াস ইরাসমাসকে Prince of the humanists বলা হয়।
>> মার্টিন লুথার প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম মতের প্রবক্তা ছিলেন।
>> হারলিখ জুইংলি সুইজারল্যান্ডের প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রচারক ছিলেন।
>> জন ক্যালভিন ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও সুইজারল্যান্ডে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্ম প্রচার করেছিলেন।
>> মার্টিন লুথার রোমান ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে ৯৫ টি নিবন্ধ (95 thesis) প্রকাশ করেছিলেন।
>> হারলিখ জুইংলি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে তার ধর্মমতের ৬৭ টি ধারা উপস্থাপন করেছিলেন।
>> প্রাচীন রোমান সভ্যতার লীলাভূমি ছিল ইতালি।

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার কি?এর বৈশিষ্ট্য। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

>> ইতালি + জার্মান= পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য।
>> রেনেসাঁ (Renaissance) প্রথম শুরু হয়েছিল ইতালিতে।
>> ধর্মসংস্কার আন্দোলন প্রথম শুরু হয়েছিল জার্মানিতে।
>> প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মালম্বী দেশ: জার্মানি, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড।
>> ক্যাথলিক ধর্মালম্বী দেশ: ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড।
>> হিউগেনো: ফ্রান্সের ক্যালভিনপন্থিদের (প্রোটেস্ট্যান্ট) হিউগেনো বলা হত।
>> পিউরিটান: ইংল্যান্ডে ক্যালভিনবাদ (প্রোটেস্ট্যান্ট) পিউরিটান ধর্মমত হিসেবে পরিচিত ছিল।
>> লুথারবাদ: রক্ষণশীল ধর্মমত।
>> ক্যালভিনবাদ: গণতান্ত্রিক ধর্মমত, হিব্রু ধর্মের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

Leave a Comment

Exit mobile version