সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার, জন্ম, খননকার্য, সময়কাল এবং পতন

খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০০ অব্দে সিন্ধু নদ কে কেন্দ্র করে যে প্রাচীন সভ্যতা গড়ে ওঠে তা হলো সিন্ধু সভ্যতা। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার হয় ১৯২১ সালে। হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো অঞ্চলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। একে অনেকে হরপ্পা সভ্যতা বলে অভিহিত করেন। বর্তমানে বহুসংখ্যক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আবিষ্কৃত হওয়ায় ভারত এবং পাকিস্তানের অনেক এলাকায় সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এটি একটি নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা ছিল। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা কারা এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও বেশিরভাগ আধুনিক প্রত্যেক মনে করেন সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা মিশ্র জাতি। জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা কৃষির উপর নির্ভরশীল হলেও শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে ছিল।

সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার:

আনুমানিক ১৮২৬ সালে চার্লস ম্যাসন পাঞ্জাবে আসেন। এসময় তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের দিক থেকে সম্ভাবনাময় একটি ঢিবি দেখেছিলেন হরপ্পায়। অতঃপর ১৮৫৩-৭৩ সালের মধ্যে ইংরেজ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম কয়েক বার জায়গাটি পরিদর্শন করেন। এর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯২১-২৪ সালের মধ্যে ভারতের প্রথম দত্ত বিভাগের কর্মকর্তা রায়বাহাদুর দয়ারাম সাহানি, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, স্যার জন মার্শাল এর নেতৃত্বে প্রত্নতাত্ত্বিক দল সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কার করেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলার মহেঞ্জোদারোতে তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের নিদর্শন পান।

১৯২২-২৩ সালে অনুসন্ধান করতে গিয়ে মাটির নিচে এক বৃহৎ নগরী, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমা, নানান মূর্তি, দ্রব্য, সীলমোহর সহ নিদর্শন পাওয়া যায়। অন্যদিকে দয়ারাম সাহানি ভারতের পাঞ্জাবের রাভি নদীর মন্টগোমারী জেলার হরপ্পা নামক স্থানে প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ১৯২১-৩৪ সালে সিন্ধু ও বেলুচিস্তানে ই.ম্যাকে, কালিনাথ দীক্ষিত,ড.এম. হুইলার, ননী গোপাল মজুমদার, এমএস ভাটের নেতৃত্বে বেশ কিছু খনন কাজ পরিচালিত হয়। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার

সিন্ধু সভ্যতার আর্থ-সামাজিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা

বি.বি.লাল, বি.কে থাপারের নেতৃত্বে ১৯৬১-৬৯ পর্যন্ত খনন কাজের ফলে রাজস্থানের কালিবঙ্গান আবিষ্কৃত হয়। বহু আবিষ্কারের ফলে প্রাচীনকালে পাঞ্জাব থেকে বেলুচিস্তান পর্যন্ত কয়েক সময়ব্যাপী স্থানে যে একটি নগর কেন্দ্রিক উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল তা পরিষ্কার জানা যায়। সিন্ধু সভ্যতায় প্রায় 2000 সীলমোহর আবিষ্কৃত হয়েছে। এই সীলমোহর গুলোতে প্রায় 270 টি অক্ষর বা হরফ চিহ্নিত করা গেলেও সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল:

 সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার না হওয়াতে এর কাল নির্ণয় প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মডেমের হুইলার মহেঞ্জোদারো শহরে সাতটি স্তর আবিষ্কার করেন। প্রতিটি স্তরের উত্থান-পতনে পাঁচশত বছর ধরে তিনি সাতটি স্তরের সময়কাল উপস্থাপন করেছেন সাড়ে তিন হাজার বছর। ড. ফ্রাঙ্কফুর্ট, সি.জে.গ্যাড, ড.ফ্যাব্রি প্রমুখ সুমেরীয় সভ্যতার স্থানে প্রাপ্ত নিদর্শন এর সাথে হরপ্পার শীলের মিল খুঁজে পান।

সুমেরীয় সভ্যতার সময়কাল যেহেতু খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০-২৪০০ অব্দের মধ্যে, সেহেতু এই সভ্যতার সময়সীমা ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তারা সিন্ধু সভ্যতার সূচনা কাল এই ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ কে মনে করেন।মাটির তলায় আরো একটি অনাবিষ্কৃত স্তরের জন্য ৫০০ বছর যুক্ত করে খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দকে সিন্ধু সভ্যতার শুরু বলা হয়। ড.সি.গ্যাড ১৯৩২ সালে মেসোপটেমিয়ায় প্রাপ্ত সীলমোহর এর সাথে হরপ্পার মিল খুঁজে পেলে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, হরপ্পার সাথে মেসোপটেমিয়ার ২৩৫০-১৭৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার

স্টুয়ার্ট পিগট মেসোপটেমিয়ার প্রত্নবস্তু পরীক্ষা করে অনুমান করেন হরপ্পা সংস্কৃতির অস্তিত্ব খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০-১৫০০ পর্যন্ত। এছাড়া হরপ্পা ও চানহুদারোতে প্রাপ্ত ঈগল পাখির ছাপওয়ালা শীল রেডিও কার্বন পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষা করে জানা গেছে খ্রিস্টপূর্ব ২৪০০ অব্দ সিন্ধু সভ্যতার কালসীমা। কারণ এই সময় একই রকম শীল সিউসায় পাওয়া গেছে।

ড.আগ্রাওয়ালের মতে সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল ২৩০০-১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ এর মধ্যে। তবে পতনের সময় কাল নিয়ে মোটামুটি সবাই একমত। সিন্ধু সভ্যতা ছিল তাম্র যুগের সভ্যতা। আর্যরা আসার পর থেকে এখানে লৌহ যুগের শুরু হয়। আর্যরা যেহেতু খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে ভারতে আগমন করে, সেহেতু ১৫০০ অব্দকেই সিন্ধু সভ্যতার পতনের সময় সীমা ধরা হয়। সার্বিক মতামত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বিবেচনা করে সিন্ধু সভ্যতার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দ এবং পতন ১৫০০ অব্দকে মনে করা হয়।

সিন্ধু সভ্যতা কে কেন হরপ্পা সভ্যতা বলা হয় 

১৯২১ ও ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো তে প্রাচীন সভ্যতার দুটি কেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়। সিন্ধু নদীর উপত্যকায় এই দুটি কেন্দ্রে অবস্থিত বলে এই সভ্যতা কে সিন্ধু সভ্যতা বলা হত। কিন্তু পরে সিন্ধু নদীর উপত্যকার বাইরে এই সভ্যতার অনেক কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া গেছে, আর এগুলোর মধ্যে হরপ্পা ছিল সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন কেন্দ্র। তাই সিন্ধু সভ্যতা কে হরপ্পা সভ্যতা বলা হয়। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার

সিন্ধু সভ্যতা প্রাপ্ত লিপি কোনটি?

সিন্ধু লিপি (ইংরেজি: Indus Script) বা হরপ্পী লিপি বলতে ২৬০০ থেকে ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত বর্তমান পাকিস্তান এবং পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের অংশবিশেষে অবস্থিত সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা বা হরপ্পার সভ্যতার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতীকের কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ট্রিংকে বোঝায়। বহু চেষ্টার পরেও এর অর্থোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার

 

1 thought on “সিন্ধু সভ্যতার আবিষ্কার, জন্ম, খননকার্য, সময়কাল এবং পতন”

Leave a Comment

Exit mobile version