সামাজিক স্তরবিন্যাস কী? স্তরবিন্যাসের বিশ্বজনীন ধরন।

সকল ঐতিহাসিক কালপর্বে মানুষে মানুষের যে বিভেদ তাকে সামাজিক স্তরবিন্যাস বলে। সামাজিক স্তরবিন্যাস কী? স্তরবিন্যাসের বিশ্বজনীন ধরন হলো কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। ল্যান্ডবার্গ এর মতে, “স্তরবিন্যস্ত সমাজ হচ্ছে অসমতার দ্বারা চিহ্নিত, যেখানেই সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে উঁচু-নিচু পদমর্যাদায় অবস্থানকারী হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।” পি.এ.সারোকিন এর মতে, “উঁচু নিচু শ্রেণীর ক্রমানুসারে সংগঠিত জনসংখ্যার মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্নতাই হল সামাজিক স্তরবিন্যাস।” ওপেন হাইমার সহ আরো কয়েকজন সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে সামাজিক স্তরবিন্যাসের উৎপত্তি হয়েছে। যারা বিজয়ী হয় তারা উঁচু অবস্থানে থেকে বিজিতদের (বিজিত বলতে যারা পরাজয় বরণ করেছে তাদেরকে বোঝানো হয়) উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। এভাবেই উঁচু-নিচু শ্রেণীভেদ সৃষ্টি হয়।

সামাজিক স্তরবিন্যাস জৈবিক এবং অজৈবিক দুটি কারনে হয়। বংশ, বয়স, শারীরিক গঠন, চেহারা, মেধা হল জৈবিক কারণ। শিক্ষা, পেশা, ক্ষমতা, সম্পত্তি হল অজৈবিক কারণ।

সামাজিক স্তরবিন্যাসের বিশ্বজনীন ধরন: 

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে স্তরবিন্যাস সব সমাজে বিদ্যমান। যে কোন সমাজে অসমতা স্থায়ী, অবশ্যম্ভাবী এবং তা ভবিষ্যতেও বহাল থাকবে। সমাজবিজ্ঞানী সারোকিনের মতে, ইতিপূর্বে সামাজিক স্তরবিন্যাস ধারণার বিলুপ্তির চেষ্টা করা হলেও এখনো তার সব ক্ষেত্রে টিকে আছে। তার মতে বিজ্ঞান, শিল্পকলা, রাজনীতি, অপরাধী সংঘ, গণতন্ত্র এবং যারা সাম্যবাদের কথা বলে তাদের মধ্যেও স্তরবিন্যাস রয়েছে। মার্কসবাদীরা শোষণ এবং বৈষম্যহীন সমাজ এর দাবি করেন কিন্তু তাদের শ্রেণীবিহীন সমাজেও ক্ষমতা, মর্যাদা, পেশার ভিত্তিতে স্তরবিন্যাস রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা চার ধরনের স্তরবিন্যাস লক্ষ্য করেন: ১) দাস প্রথা, ২জাতিবর্ণ, ৩) এস্টেটস, ৪) সামাজিক শ্রেণী ও মর্যাদা।

১) দাস প্রথা: 

প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় দাস প্রথা প্রচলিত ছিল। প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান সভ্যতার যুগ ও আঠারো উনিশ শতকের আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে দাসপ্রথার চরম দৃষ্টান্ত দেখা যায়। দাসপ্রথা হচ্ছে আইনের দ্বারা নির্ধারিত ব্যবসা। সাধারণত যুদ্ধে পরাজিত ব্যক্তিদের দাসে পরিণত করা হয়। চরম অবস্থায় দাস সম্পূর্ণ অধিকার বিহীন ব্যাক্তি মালিকের অস্থাবর সম্পত্তি। স্বাভাবিক অবস্থায় তার নিরাপত্তা থাকে। মালিক তাকে কোন রকম বেঁচে থাকার জন্য খাওয়াই ও আশ্রয় দেয়। (সামাজিক স্তরবিন্যাস কী? স্তরবিন্যাসের বিশ্বজনীন ধরন)

দাস প্রথার বৈশিষ্ট্য:

১) ক্রীতদাস তার মালিকের একচ্ছত্র সম্পত্তি।
২) তাদের রাজনৈতিক মতামত, ভোট দেয়ার অধিকার ছিলনা।
৩) তারা ছিল নিম্নমানের জীবন ধারী।
৪) তাদেরকে মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে হতো।
দাসপ্রথার চারটি ধরন দেখা যায়: ১) আদিম সমাজ ২) প্রাচীন সমাজ ৩) মধ্যযুগের সমাজ ৪) এবং আধুনিক সমাজ।

দাস ব্যবস্থায় স্তরবিন্যাস:

বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে দাসদের সবার দাম এক ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে স্তরবিন্যাস দেখা যায়। যেমন: পারদর্শিতার ভিত্তিতে, স্ত্রী-পুরুষ ভেদে, শারীরিক গঠন, বয়সভেদে দাস দাম এর তারতম্য ছিল। আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে দাস মালিকদের মধ্যেও স্তরবিন্যাস দেখা যায়।

২) জাতি-বর্ণ: 

সামাজিক স্তরবিন্যাসে জাতিবর্ণে বেশি পার্থক্য দেখা যায়। জাতি বর্ণ হল অন্তর্বিবাহ মূলক গোষ্ঠী। ভারতীয় বর্ণ চতুষ্টয় মূলত পেশাজীবী গোষ্ঠী। তাদের কাজ হল: ১) ব্রাহ্মণ (জ্ঞান), ২) ক্ষত্রিয় (রাজনীতি), ৩) বৈশ্য (ব্যবসা), ৪) শূদ্র (সেবা)। ব্রাহ্মণরা তিন শ্রেণীর মানুষকেই নিচু শ্রেণীর মনে করত। জাতিবর্ণের পরস্পর নির্ভরশীলতা এবং যজমানি ভারতীয় জাত পাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যজমানি ব্যবস্থা হল আগেকার সময়ের গ্রামীণ অর্থনীতি ব্যবস্থার আর্থসামাজিক প্রথা। পূর্বেকার সময়ে জাতি বর্ণে সামাজিক স্তরবিন্যাস প্রকট থাকলেও বর্তমানে পরস্পর নির্ভরশীলতা কম বেশি বিদ্যমান। শিক্ষিত হয়ে নিচু শ্রেণীর মানুষরা ব্রাহ্মণদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

৩) এস্টেটস Estate :

সামাজিক শ্রেণীতে প্রতিটি ভিন্ন গোষ্ঠী এস্টেটস নামে পরিচিত। প্রথম শ্রেণীতে যাজক (clergy), দ্বিতীয় শ্রেণীতে অভিজাত (nobles), তৃতীয় শ্রেণীতে সাধারন মানুষ (commons). প্রতিটি এস্টেটস এর আইন দ্বারা নির্ধারিত ক্ষমতা এবং মর্যাদা ছিল। সমাজে একজন ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা জানতে হলে দেখতে হতো আইন অনুযায়ী তার মর্যাদা কোথায়। সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করতো যাজকরা এবং অভিজাতরা। ধ্রুপদী সামন্তবাদে যাজক এবং অভিজাত এই দুই শ্রেণীর মধ্যবর্তী বুর্জোয়া শ্রেণি গড়ে ওঠে। সবার জন্য সমান আইন না থাকায় বুঝা যায় এস্টেটস এ স্তরবিন্যাস ছিল। এই পর্যায়ে দাসরা ভূমিদাসে পরিণত হয়। তাদের মানুষ বলে মনে করা হতো না বলে estate এ জায়গা দেয়া হয়নি।

৪) সামাজিক শ্রেণী ও মর্যাদা: 

সামাজিক শ্রেণীর ভিত্তি অর্থনৈতিক। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে, সমাজ বিজ্ঞানীরা চারটি প্রধান শ্রেণী শনাক্ত করেছেন।
১) উচ্চ শ্রেণি: সমাজের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক।
২) মধ্যবিত্ত শ্রেণি: বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত সদস্য।
৩) শ্রমিক শ্রেণি: শিল্প উৎপাদনে নিয়োজিত মজুরি অর্জনকারী।
৪) কৃষক: কোন কোন সমাজে কৃষকদের চতুর্থ শ্রেণি ধরা হয়।

আমেরিকান সমাজ ব্যবস্থা ৬ টি শ্রেণীতে বিভক্ত। শিল্পায়িত সমাজে একাধিক মর্যাদা গোষ্ঠী এবং শ্রেণি অস্তিত্বের কারণে স্তরবিন্যাসের চিত্রাংকন জটিল হয়েছে। ম্যাক্স ওয়েবারের মতে, “সামাজিক শ্রেণী উৎপাদন সম্পর্ক এবং বন্টন প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে গঠিত। মর্যাদা গোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্যের কারণ হচ্ছে উৎপাদিত দ্রব্য ভোগ সংক্রান্ত নীতি।” টি.এইচ মার্শালের মতে, বর্তমানে শ্রেণীভিত্তিক স্তরায়ন থেকে এখন মর্যাদা ভিত্তিক স্তরায়নে রূপান্তর ঘটেছে। সামাজিক শ্রেণী থেকেই মর্যাদার উৎপত্তি। প্রতিটি শ্রেণীতেই মর্যাদা সৃষ্টি হয় সামাজিক স্তরবিন্যাসের উৎপত্তি হয়েছে।

Reference: 

1) Richard T. Schaefer, Sociology.
২) রংগলাল সেন এবং বিশ্বম্ভর কুমার নাথ, প্রারম্ভিক সমাজ বিজ্ঞান।
৩) হাবিবুর রহমান, সমাজ বিজ্ঞান পরিচিতি।
4) T.B. Bottomore, Sociology.

1 thought on “সামাজিক স্তরবিন্যাস কী? স্তরবিন্যাসের বিশ্বজনীন ধরন।”

Leave a Comment

Exit mobile version