সামাজিকীকরণ কি? প্রকারভেদ ও বাহন উদাহরণসহ।

সামাজিকীকরণ এর সংজ্ঞা:

সামাজিকীকরণ হল সমাজে বসবাস করার উপযুক্ত প্রক্রিয়া। বোগারডাস বলেছেন, “সামাজিকীকরণ হচ্ছে একত্রে কাজ করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার গোষ্ঠীগত দায়িত্বের প্রকাশ ঘটায় এবং এর মাধ্যমে সে সমাজের মঙ্গল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়।” অগবার্ন এর মতে, “ব্যক্তি যে প্রক্রিয়ায় গোষ্ঠীর নিয়মকানুন আত্মস্থ করে সেই প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলে।” সামাজিকীকরণ একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া যা জন্মের পরেই শুরু হয়। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোন ব্যক্তি মানুষের প্রচলিত নিদর্শনগুলো অর্জন করে। প্রতিটি ব্যক্তি নিজেকে সেই পরিস্থিতি ও পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে, যা মূলত সমাজে দ্বারা নির্ধারিত হয়, যার দ্বারা সে একজন সামাজিক জীব বা সদস্যে পরিণত হয়। উপরের সংজ্ঞার আলোকে বলা যায়, সামাজিকীকরণ হচ্ছে একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া, যা শিক্ষার্থীকে তার সামাজিক ভূমিকা যথার্থভাবে পালনে সক্ষম করে।

সামাজিকীকরণের প্রকারভেদ: 

সামাজিকীকরণ চার প্রকার। যথা:
১) মুখ্য সামাজিকীকরণ
২) প্রত্যাশিত সামাজিকীকরণ
৩) উন্নয়নমূলক সামাজিকীকরণ
৪) পুন: সামাজিকীকরণ

১) মুখ্য সামাজিকীকরণ: 

সাধারণত বাচ্চারা যা শেখে তাই মুখ্য সামাজিকীকরণ। এ ধরনের সামাজিকীকরণ তখন ঘটে, যখন একটি শিশু ঐ নিয়ম, মূল্যবোধ, আচার আচরণ শিখে, যেগুলো একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সাথে মানানসই জীবনযাপনের জন্য প্রদর্শন করা উচিত। একটি শিশুর সাত-আট বছরের মধ্যেই সমন্বয় পূর্ণভাবে শারীরিক এবং মানসিক উন্নয়নের জন্য এটি প্রয়োজন। এসময় শিশু যা দেখবে সেটাই শিখবে। উদাহরণস্বরূপ: শিশু যদি তার বাবাকে একজন বয়স্ক লোকের সাথে খারাপ আচরণ করতে দেখে তাহলে সে ভাববে এই আচরণ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। তাই সেও বয়স্ক লোকদের সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করবে।
মুখ্য সামাজিকীকরণ এর কয়েকটি উদাহরণ: বাচ্চা যা পরিবার থেকে শিখে তা ই মুখ্য সামাজিকীকরণ, সুন্দর, ব্যবহার, কান্না, হাঁসা, যোগাযোগ, ভালোবাসা, দুঃখ।

২) প্রত্যাশিত বা আগাম সামাজিকীকরণ: 

এধরনের সামাজিকীকরণ সেই প্রক্রিয়াকে বুঝায় যেখানে একজন ব্যক্তি ভবিষ্যতের সামাজিক সম্পর্কের জন্য অনুশীলন করেন। কেউ যখন নতুন একটি দল বা গোষ্ঠী তে প্রবেশ করতে চায় তখন তাকে নিজেকে ওই দল বা সমাজের মত পরিবর্তন করতে হয়। এটি হলো প্রত্যাশিত বা আগাম সামাজিকীকরণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি শিশু পিতৃত্বের প্রত্যাশা করে যখন সে তার বাবা-মাকে তাদের দৈনন্দিন জীবনে ভূমিকা পালন করতে দেখে। যারা বিশ্ববিদ্যালয় আইন নিয়ে পড়াশোনা করে তারা শিখছে কিভাবে আইনজীবিদের মতো আচরণ করতে হয়। অর্থাৎ একটি শিশুর পিতা হওয়ার প্রত্যাশা, আইনজীবী হওয়ার অনুশীলন, ডাক্তার হওয়ার অনুশীলন, গাড়ি চালানোর অনুশীলন, কম্পিউটার চালানোর অনুশীলন ইত্যাদি হলো প্রত্যাশিত সামাজিকীকরণ।

৩) উন্নয়নমূলক সামাজিকীকরণ: 

এই সামাজিকীকরণ একটি শেখার প্রক্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে যেখানে সামাজিক দক্ষতা বিকাশের দিকে মনোনিবেশ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: একজন লাজুক ছাত্র মৌখিক যোগাযোগ বিকাশের জন্য নতুন নতুন শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শেখাতে শুরু করে।

৪) পুন: সামাজিকীকরণ: 

এধরনের সামাজিকীকরণে পূর্ববর্তী আচরণের ধরন গুলি প্রত্যাখ্যান করা এবং নতুন আচরণ, অভ্যাস গ্রহণ করা যাতে করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার জীবনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে স্থানান্তরিত হতে পারে। এর প্রথম পর্যায় হলো একজন ব্যক্তির পূর্বের বিশ্বাস এবং আস্থা ধ্বংস করা। পুনঃ মানবজীবনের চক্র জোরে বইছে বলে বলা হয়ে থাকে। পুনঃসামাজিকীকরণ ২ প্রকার। যথা: ইচ্ছাকৃত এবং অনিচ্ছাকৃত। ইচ্ছাকৃত পুনঃসামাজিকীকরণের উদাহরণ: বিবাহ, কলেজে ভর্তি, সন্ন্যাস গ্রহণ, সৈনিকে যোগদান, নতুন দেশে গমন, ডিভোর্স/তালাক। অনিচ্ছাকৃত পুনঃসামাজিকীকরণের উদাহরণ: বন্দী হওয়া, বেকারত্ব, বিধবা হওয়া।

সামাজিকীকরণের বাহনসমূহ: 

সামাজিকীকরণ শুরু হয় শিশুর জন্ম লগ্নে, একজন ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত চলতে থাকে। সাম্প্রতিককালের সামাজিকীকরণ প্রত্যয়টি প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আচরণ আলোচনা স্থান পেয়েছে যা আগে শিশুর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠীকে এর বাহন হিসেবে গণ্য করা হয়। নিচে সামাজিকীকরণের প্রধান বাহন সমূহের ভূমিকা আলোচনা করা হলো:

১) পরিবার: 

পিতা-মাতা বা পরিবারের মাধ্যমেই শিশুর সামাজিকীকরণ এর সূত্রপাত ঘটে। পিতামাতার কাছ থেকেই শিশু কথা বলা শিখে। নৈতিকতার শিক্ষা লাভ করে। পরিবারের পিতামাতাকে শ্রদ্ধা করার মাধ্যমে কর্তৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠে। শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা অপরিহার্য। সহযোগিতা, সহিষ্ণুতা, আত্মবিসর্জন, স্নেহ, ভালোবাসা ইত্যাদি সামাজিক ও নৈতিক গুণাবলী শিশু পরিবার থেকেই অর্জন করে কিন্তু প্রতিকূল পারিবারিক পরিবেশে শিশু বিপথগামী হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে কিশোর অপরাধ এর মূলে রয়েছে প্রতিকূল পারিবারিক পরিবেশ।

২) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: 

সামাজিকীকরণের দ্বিতীয় বাহন হল স্কুল। স্কুলে শিশু যা শিখে তা তার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি কে প্রভাবিত করে। ভালো স্কুলে পড়াশোনা করলে শিশুর গুণাবলীর পথ সুগম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। স্কুল সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে। পরিবার থেকে স্কুলে ভর্তি হওয়া একটি শিশুর জীবনে কঠিন পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত। প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবার এবং স্কুলের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। পরিবারের চেয়ে স্কুল অধিকতর নৈর্ব্যক্তিক, রুটিনমাফিক। শিক্ষাগ্রহণ একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সর্বস্তরে শিশুর অভিন্ন শিক্ষা তথা একই ধরনের সামাজিকীকরণ সম্ভব নয়।

৩) খেলার সাথী: 

সমবয়সী, খেলার সাথী, বন্ধুবান্ধব সামাজিকীকরণ এর গুরুত্বপূর্ণ বাহন। শিশুর সামাজিকীকরণ এর দিক থেকে সম্পর্ক দুই ধরনের। কর্তৃত্বমূলক এবং সমতাভিত্তিক। খেলার সাথী, বন্ধু, সমবয়সীদের সাহচর্যে সামাজিকীকরণ এর মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উপলব্ধির বিকাশ ঘটে। শিশুরা সমবয়সীদের নিকট থেকে যা পায় তা তাদের পরিবার বা শিক্ষকের কাছে পায় না। তারা সহযোগিতামূলক নৈতিকতা, ফ্যাশন পছন্দ-অপছন্দের বিষয়াদি গ্রহণ করে। সমাজবিজ্ঞানে সমবয়সী গোষ্ঠী বলা হয়। যেসব শিশুর দিনের বেলা অন্তত ৮ ঘন্টা একত্রে থাকে এবং খেলাধুলা করে সময় কাটায় তাদের ভেতর সমবয়সী বন্ধু বর্গের পারস্পরিক বন্ধন আগের চেয়ে আধুনিককালে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমবয়সীদের মধ্যেও যারা অধিকতর শক্তিশালী তারা প্রায়ই দুর্বল সমবয়সীদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। সমবয়সী বন্ধু বর্গের ভেতর শিশুরা ভিন্নমাত্রায় মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়। একজন ব্যক্তির সমগ্র জীবন সমবয়সী বন্ধু বর্গের সম্পর্ক দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

৪) ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান: 

প্রাচীন বিশ্বের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিক সমাজে ধর্মের ভূমিকা হ্রাস পাচ্ছে যদিও। প্রত্যেক পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যাতে বয়স নির্বিশেষে পরিবারের সবাই অংশগ্রহণ করে। শিশুরা লক্ষ্য করে পিতা-মাতা এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা কিভাবে ধর্মীয় আচার পালন করেন। তারা এসব দেখে নিজের জীবনকে পিতামাতার মত পরিচালিত করার অনুপ্রেরণা পায়।

৫) রাষ্ট্র: 

রাষ্ট্র হল সামাজিকীকরণের কর্তৃত্বমূলক বাহন। রাষ্ট্র জনগণের জন্য আইন প্রণয়ন করে যা মেনে চললে তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক, আইন লংঘন করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। এভাবে রাস্তা মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ এর মাধ্যমে সামাজিকীকরণে ভূমিকা পালন করে।

৬) গণমাধ্যম: 

আধুনিক সমাজের শিশুরা টেলিভিশন এবং অন্যান্য গণমাধ্যমের প্রভাবে সামাজিক আচরণ এবং ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারে। সংবাদপত্র, রেডিও, চলচ্চিত্রের মাধ্যম দ্বারা বিচিত্র ধরনের পাঠক,দর্শক, শ্রোতার মধ্যে প্রতিটি ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব। টেলিভিশন সবচেয়ে জনপ্রিয় গণমাধ্যম। এখানে বিনোদনমূলক শিশুরা প্রভাবিত হয়। বয়স অনুসারে অনুষ্ঠান দেখার মধ্যে তারতম্য দেখা যায়। আঠারো শতক থেকে পাশ্চাত্যে সংবাদপত্র, সাময়িকী, জার্নাল ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। সমাজের একটি ক্ষুদ্র পাঠক শ্রেণীর মধ্যে এসব সীমাবদ্ধ ছিল। একশত বছর পর মুদ্রিত বই পুস্তক, পত্রিকা, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত হয়। এসবের সাথে বৈদ্যুতিক যোগাযোগ এবং টেলিভিশনসহ অন্যান্য গণমাধ্যম যুক্ত হওয়ায় সামাজিকীকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামাজিকীকরণের আরেকটি বাহন হল কর্মক্ষেত্র

Reference: 

1) Richard T. Schaefer, Sociology.
২) রংগলাল সেন এবং বিশ্বম্ভর কুমার নাথ, প্রারম্ভিক সমাজ বিজ্ঞান।
৩) হাবিবুর রহমান, সমাজ বিজ্ঞান পরিচিতি।
4) T.B. Bottomore, Sociology.

2 thoughts on “সামাজিকীকরণ কি? প্রকারভেদ ও বাহন উদাহরণসহ।”

Leave a Comment

Exit mobile version