সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন ও রীতিনীতি

সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন ভারতে মুসলিম যুগের ইতিহাসে সম্রাট আকবর দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা স্থাপন করেন। আকবর ধর্ম বিষয়ে উদারতা ও সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করে সব ধর্মের সার কথা নিয়ে দীন-ই-ইলাহী নামক একটি নতুন একেশ্বরবাদী ধর্ম প্রচার করেন। তিনি তার পিতা-মাতা, গৃহশিক্ষক, সুফি দরবেশ, সমন্বয়বাদী পুরুষের দর্শনে প্রভাবান্বিত হন। দীন-ই-ইলাহীর মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক হওয়ায় এটি জনসাধারণের মনে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি।

আকবরের পরিচয়: 

শেরশাহের আক্রমণে হুমায়ুন পলায়মান অবস্থায় ছিলেন। তখন অমরকোটের হিন্দু রাজা রণপ্রসাদের গৃহে হুমায়ুন আশ্রয় নেন। অমরকোটে হুমায়ুনের স্ত্রী হামিদা বানু বেগমের গর্ভে আকবর ১৫ অক্টোবর ১৫৪২ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। হুমায়ুন তার পুত্রের জন্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করলেও আকবরের পুঁথিগত শিক্ষা লাভের জন্য কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি বাল্যকালে অস্ত্রচালনা, শিকার, খেলাধুলা এবং অশ্বারোহণে কৃতিত্ব দেখান। ১৫৫১ সালে আকবর কে গজনীর শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এসময় রোকিয়া বেগম এর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। ১৫৫৬ সালে পিতা হুমায়ূনের মৃত্যু হলে ১৩ বছর ৪ মাস বয়সে আকবর মোগল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহন করেন।

ধর্মনীতি:

 সম্রাট আকবর একজন নিবেদিতপ্রাণ ও ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান ছিলেন। কিন্তু ১৫৭৬ সালে তার ধর্মীয় মতবাদ ও অনুরাগে বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়। তাই তিনি ১৫৮২ সালে নতুন ধর্মমত ঘোষণা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একই শান্তি এবং প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করা। এই ধর্ম অনুসারে সকল অনুসারীরা আকবরের প্রতি অনুগত থাকবে এবং বিশ্বাস করবে আকবর ঈশ্বরের ইচ্ছায় শাসন করেছেন।

আকবরের ধর্মমত প্রবর্তনের কারণ: 

আকবরের ধর্মমত এর মূলে ৮টি কারণ নিহিত রয়েছে সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল:
১) পারিবারিক পরিবেশ ও শিক্ষক এর প্রভাব: আকবরের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে ধর্মীয় উদারতা দেখা যায়। আকবরের পিতা হুমায়ুন ছিলেন সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত। আকবরের মাতা হামিদা বানু বেগম ছিলেন শিয়া ধর্মে বিশ্বাসী এবং তার গৃহশিক্ষক আব্দুল লতিফ ছিলেন উদার মতালম্বী। শিক্ষক আব্দুল লতিফের জীবনের নীতি ছিল “সুলহ ই কুল” অর্থাৎ বিশ্বজনীন সহিষ্ণুতা। সুতরাং পূর্বপুরুষ ও শিক্ষকের ধর্মাদর্শ আকবরের মানসিকতাকে প্রভাবিত করে। ফলে আকবর ধর্ম বিষয়ে উদারতা ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা লাভ করেন।

২) ষোড়শ শতাব্দীর প্রভাব: পৃথিবীর ইতিহাসে ষোড়শ শতাব্দী ছিল ধর্ম আন্দোলন ও অনুসন্ধিৎসার যুগ। ভারতবর্ষে কবির, নানক, শ্রীচৈতন্য প্রভৃতি মহাপুরুষের প্রচারিত ‘ভক্তিবাদ’ আন্দোলন আকবরের উদার মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রতিভাবান রাষ্ট্রনীতিক আকবর এই সমন্বয়বাদী চিন্তা ধারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন।

৩) রাজপুত পত্নীদের প্রভাব: আকবরের রাজপথ হিন্দু পত্নীদের রাজ অন্তঃপুরে হিন্দুদের সামাজিক রীতিনীতি ও অনুষ্ঠান তার মানসিক গতির পরিবর্তন করে। ফলে তিনি জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

৪) সুফিদের প্রভাব: সম্রাট আকবর প্রথম জীবনে কাবুলে অবস্থানকালে সুফিদের সংস্পর্শে আসেন। ঐতিহাসিক ডঃ ইউসুফ হাসানের মতে সুফিবাদের “ওয়াহদাতুল ওজুদ” মতবাদের ভ্রান্ত ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী গড়ে ওঠে। এসব সূফী-দরবেশগণ পারস্য থেকে অত্যাচারিত হয়ে কাবুলে আসেন।

৫) মাহদী ও রাসনী মতের প্রভাব: সম্রাট আকবর তার ধর্মনীতির প্রণয়নে জৈনপুরের সৈয়দ মুহম্মদ এর ‘মাহদী’ আন্দোলন এবং আফগান স্থানের রাসনী আন্দোলনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এছাড়া আকবরের বন্ধু এবং সভাসদ আবুল ফজল, তার পিতা এবং ভাই আকবরের উপর উপর প্রভাব ফেলেন। তারা বুদ্ধিজীবী ও যুক্তিবাদী লোক ছিলেন।

৬) শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব: সম্রাট আকবরের দরবারে শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব-কলহ বিরাজমান ছিল। এর ফলে তিনি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন এবং বিকল্প ধর্মনীতির ব্যাপারে চিন্তা করতে থাকেন।

৭) জৈন ধর্মের প্রভাব: 

সম্রাট আকবর 1582 সালে জৈন ধর্মের সংস্পর্শে আসেন। তিনি ক্রমে অহিংস নীতির প্রতি অনুরাগী হন। এজন্য তিনি পশু হত্যা, শিকার প্রভৃতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ও নিজে নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করেন এবং জৈন ধর্মের বাস্তবতা স্বীকার করেন। এছাড়া জরথ্রুস্টবাদের প্রভাবে তিনি সূর্য বা অগ্নি উপাসনা শুরু করেন। আকবরকে সব ধর্মের গ্রন্থ গুলো পাঠ করে শুনানো হয়েছিল এবং তিনি স্বীকার করেন সব ধর্মের মূল কথা এক কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠান গুলো ভিন্ন। ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং আনুষ্ঠানিকতা দূর করলে ধর্ম সমন্বয় সম্ভব।

৮) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: ধর্ম অপেক্ষা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী প্রচার করেন। পার্সিভ্যাল স্পিয়ার ও অন্যান্য ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে আকবরের ধর্মমত এর পশ্চাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। সকল ধর্ম ও গোত্রের মানুষকে এক ঐক্যবদ্ধ সূত্রে আবদ্ধ করে একটি সর্বভারতীয় জাতিগঠনের মাধ্যমে সাম্রাজ্য কে শক্তিশালী করাই ছিল আকবরের লক্ষ্য। রাজনৈতিক সংস্থা হিসেবে এটি আকবরের আশা অনেকটা পূরণ করেছিল।

দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তনে ধারাবাহিক পদক্ষেপঃ

উপযুক্ত কারণ ঘটনা সমূহ এর প্রেক্ষিতে সম্রাট আকবর নিম্নলিখিত পন্থাগুলো গ্রহণ করেন:
১) ইবাদৎখানা নির্মাণ: সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে সত্যের সন্ধান লাভের আশায় ফতেপুর সিক্রিতে ইবাদতখানা নির্মাণ করে বিভিন্ন ধর্মের প্রখ্যাত ব্যক্তিদের ধর্ম আলোচনার জন্যে আহ্বান করেন। সুন্নীমতে শেখ আব্দুন নবী, শেখ তাজউদ্দিন নকিব খান প্রমুখ সম্রাটকে ইসলামের কথা বুঝান।

২) ধর্মীয় সমাবেশ: পরধর্ম সহিষ্ণু আকবর বিভিন্ন ধর্মে সারমর্ম উপলব্ধি করার জন্য ইবাদত খানায় মুসলিম, হিন্দু, জৈন, খ্রিষ্টান, অগ্নি উপাসক, পারসিক প্রভৃতি সম্প্রদায়কে অভ্যর্থনা জানান। এ সমাবেশে যোগ দেন শেখ আব্দুল নবী, ফাদার মনসা রেট, জেসুইট পাদ্রীগণ, হিন্দু পন্ডিত পুরুষোত্তম, জৈন পন্ডিত হীরা বিজয়সুরী সহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মগুরু গণ।

৩) মহজরনামা ঘোষণা: ১৫৭৯ সালে আকবর ফতেপুর সিক্রির প্রধান ইমাম কে অপসারণ করে ধর্মগুরুর অভ্রান্ত সর্বময় কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন। ধর্মীয় আইন অনুসারে অনভিজ্ঞ আকবর এ ঘোষণা দ্বারা ওলামাদের অগ্রাহ্য করেন। এ ঘোষণা দাঁড়া তিনি সকল ধর্ম সম্বন্ধীয় ব্যাপারে সর্বোচ্চ বিচারকে পরিণত হলেন মহাজন ঘোষণাপত্র জারি করে আকবর ওলামাদের ধর্মনৈতিক অধিকার খর্ব করেন। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ মহজরনামাকে “অভ্রান্ত কর্তৃত্বের ঘোষণা” বলে অভিহিত করেছেন।

৪) দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন:

 ১৫৮২ সালে আকবর বিভিন্ন ধর্মের সারবস্তু নিয়ে দীন-ই-ইলাহী নামক তার নতুন ধর্ম মত ঘোষণা করেন। যার অর্থ ঈশ্বরের ধর্ম। আর আকবর নিজেকে ঘোষণা করেন খলীফাতুল্লাহ অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতিনিধি। এ ধর্মে কালেমা ছিল “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আকবর খলীফাতুল্লাহ” অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মহান আকবর সেই আল্লাহর প্রতিনিধি। বদাউনি দীন-ই-ইলাহির সংজ্ঞা দানকালে একে “তৌহিদ ই ইলাহি” বা ঐশী একেশ্বরবাদ বলে অভিহিত করেন।

ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদের মতে, “দ্বীন-ই-ইলাহী হল একটি উদাহরণ ধর্মীয় মতবাদ-সকল ধর্মের যা কিছু ভালো আছে তা এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।” দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে আকবর এই নব ধর্মের উদ্ভাবন করেন তাই এটাকে ধর্ম না বলে ধর্মীয় সমাজ বিধি বলা উচিত। অধ্যাপক আর শর্মা বলেন- “দীন-ই-ইলাহি কে ধর্ম বলে স্বীকার করলে অতিশয়োক্তি করা হবে। এর জন্য কোন কিতাব নাজিল হয়নি, কোন পয়গম্বরও এটি প্রচার করেননি, এমনকি এর মহৎ কোন ধর্ম বিশ্বাসও নেই।”

৫) দীন-ই-ইলাহীর রীতিনীতি: 

সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী ধর্মালম্বীদের আদর্শ ও রীতিনীতি ছিল অন্যরকম। নিচে তা বর্ণনা করা হলো:
১) দ্বীন-ই-ইলাহী অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর দেখা হলে একজন বলতো “আল্লাহু আকবার” প্রত্যুত্তরে আরেকজন বলতো “জাল্লেজালালুহু”।
২) এ ধর্মের অনুসারীদের মৃত্যুর পূর্বে ভুজের ব্যবস্থা করতে হতো।
৩) এ সম্প্রদায়ের প্রত্যেককে জন্মবার্ষিকী পালন করতে হতো এবং স্বধর্মীদের দাওয়াত দিয়ে প্রীতিভোজের আয়োজন করতে হতো।৪) এ ধর্মের অনুরাগীরা যতদূর সম্ভব নিরামিষ ভোজন কত।
৫) বাল্য বিবাহ করত না এবং নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ করত না।

৬) সূর্য পূজা করত। দিনে চারবার সূর্য বন্দনা করত। সকাল-দুপুর-বিকেল রাতে।
৭) খ্রিস্টানদের সপ্তাহের শুরুর দিন রবিবার এর সাথে মিলিয়ে ধর্মাবলম্বীরাও রবিবার কে সপ্তাহের শুরু ধরত।
৮) পশু হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়।
৯) অহিংসা পালন করতো এবং নৈতিক জীবন যাপন করত।
১০) এ ধর্মের সভ্যগণ ভিক্ষা প্রদান করবেন কিন্তু ভিক্ষা গ্রহণ করবেন না।
১১) অগ্নিকে পবিত্র জ্ঞান এবং সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করতে হত।

৬) শ্রেণীবিভাগ: আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী অনুসারীদের মধ্যে চারটি শ্রেণীবিভাগ ছিল। জান, মাল, সম্মান ও ধর্ম। এ বিষয়গুলো সম্রাটের নামে উৎসর্গ করা হতো। যারা এই চারটি স্তম্ভ বিসর্জন দিবে তারা প্রথম শ্রেণীর অনুসারী, যারা তিনটি দিবে তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর অনুসারী, যারা দুটি দিবে তারা তৃতীয় শ্রেণীর অনুসারী এবং যারা একটি ছাড়তে প্রস্তুত চতুর্থ শ্রেণীর অনুসারী। আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীর অনুসারীরা পীর বা গুরু মনে করত। তিনি প্রতি রোববার নতুন প্রার্থীদের ধর্মে দীক্ষা দিতেন। দ্বীন-ই-ইলাহির সাথে আকবরের সূর্য এবং অগ্নি উপাসনার সম্পর্ক ছিল না।

৭) দ্বীন-ই-ইলাহির সদস্য সংখ্যা: 

আইনে আকবরের মতে, দ্বীন-ই-ইলাহী সম্প্রদায়ের সদস্য সংখ্যা ছিল আঠারো। বদাউনির মতে দ্বীন-ই-ইলাহির সদস্য সংখ্যা ছিল ২০ বা ২৫ জন। এ ধর্মমতের অনুসারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- শেখ মোবারক, আবুল ফজল, ফৈজী, আজিজ কোকা, বীরবল। অনুসারীদের মধ্যে রাজা বীরবল ছিলেন একমাত্র হিন্দু।

৮) দ্বীন-ই-ইলাহির পরিণতি: 

সম্রাট আকবর প্রবর্তিত নতুন ধর্মের স্থায়িত্ব ছিল খুবই অল্প সময়। সাধারণ লোক আকবরের ধ্যান-ধারণা বুঝতে পারেননি বলে তার ধর্ম বিশ্বাস গ্রহণ করেননি। এই ধর্মবিশ্বাস কর্তৃপক্ষের সক্রিয় সমর্থন লাভ করতে ও সমর্থন হয়নি। তাই আকবরের মৃত্যুর সাথে সাথে (আকবরের মৃত্যু হয় ১৬০৫ সালে) দ্বীন-ই-ইলাহির বিলুপ্তি ঘটে।

৯) সমালোচনা: 

আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী ছিল অজ্ঞতাপ্রসূত একটি নীতি। ধর্মমত প্রবর্তনের সময় তিনি ভুলে যান যে ধর্ম মানুষের সৃষ্টি হয় এবং এর উপাদান সমূহ অন্য ধর্ম থেকে ধার করে সংযোজন করা যায় না। বিনোদপুরের এই ধর্ম মতের কড়া সমালোচনা করেছেন- ঐতিহাসিক বদাউনীর মতে, “দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন এর পরে সম্রাট আকবর ইসলাম বিরোধী আইন প্রণয়ন করেন”

ঐতিহাসিক স্মিথ বলেন, “আকবর প্রথম জীবনে ধর্মের প্রতি তিক্ত বিরোধিতা প্রদর্শন করেন এবং প্রকৃতপক্ষে ইসলামের অবমাননা করেন। তিনি আরো বলেন এই পবিত্র ধর্মমত আকবরের জ্ঞানের নয় বরং নির্বুদ্ধিতার স্মৃতিস্তম্ভ। সমগ্র প্রকল্পটি হাস্যকর দম্ভঃ একটি অসংযত স্বৈরাচারের ফলশ্রুতি।” ঐতিহাসিক হ্যাগ এর মতে, “পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম অনুসারীদের নির্যাতন করেন এবং উপসনালয় গুলো ধ্বংস করেন।” কিন্তু ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ, এমএল রায়চৌধুরী সহ আরো কিছু আধুনিক ঐতিহাসিকগণ উক্ত মতের বিরোধিতা করে বলেন ,”আকবর কখনো ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করেননি”

১০) আকবরের ধর্মচিন্তায় ইসলামের স্থান: 

দীন-ই-ইলাহি কে একশ্রেণীর গবেষক ইসলামের ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন। কেননা দ্বীন-ই-ইলাহী ইসলামের স্বীকৃত পাঁচটি মূল স্তম্ভ, কোরআন ও পয়গম্বরের উল্লেখ নেই। তাছাড়া আকবর মাহাদী রূপে পয়গম্বর এর পুনরাগমনের কথাও স্বীকার করেন নি। অপরদিকে ড.আর.পি.ত্রিপাঠী, ড. এম এল রায় চৌধুরী প্রভৃতির মতে, আকবর গোঁড়া মুসলমান না হলেও সংস্কারবাদী ও সংশয়বাদী মুসলমান ছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত দ্বীন-ই-ইলাহী কোন ধর্ম মত ছিল না। কারণ এ ধর্মমতের কোন ধর্ম শাস্ত্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ধর্মপ্রচারক, ধর্মীয় উপাসনালয় ছিলনা। ড.ত্রিপাঠীর মতে, দ্বীন-ই-ইলাহী ছিল কতকগুলি নৈতিক আচরণবিধির সমন্বয়।

প্রকৃতপক্ষে সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী তে  ধর্মের চাপ থাকলেও এটি ছিল একটি রাজনৈতিক দলিল। সম্রাট আকবর ধর্মীয় চেতনাবোধের মাধ্যমে মোগল সিংহাসনে রাজনৈতিক আনুগত্য লাভ করে মোগল সাম্রাজ্য কে একটি জাতীয় রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগই উঠুক না কেন, তিনি মধ্যযুগের বিশ্ব ইতিহাসে পরধর্ম সহিষ্ণুতা এর ক্ষেত্রে এক অনন্য স্থানের অধিকারী।ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেন,”ধর্মীয় পদ্ধতি হিসেবে দ্বীন-ই-ইলাহির সফলতা-ব্যর্থতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হয়।” দ্বীন-ই-ইলাহী আকবর কে ভারতবর্ষের ইতিহাসের এক মহান জাতীয় সম্রাটে পরিণত করে।

Source:

 Akbar- V.A. smith

আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী

ড. ঈশ্বরী প্রসাদের A short history of Muslim rule in India

এস.আর. শর্মার India at the death of Akbar

আব্দুল করিমের ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন

এ কে এম আব্দুল আলীমের ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস এবং

জেসুইটদের রচনা।

1 thought on “সম্রাট আকবরের ধর্মমত দীন-ই-ইলাহী প্রবর্তন ও রীতিনীতি”

Leave a Comment