সমাজবিজ্ঞানের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক,পার্থক্য এবং নির্ভরশীলতা

ফরাসী সমাজবিজ্ঞানী অগাস্ট কোঁৎ প্রথম Sociology শব্দ টি ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। অগাস্ট কোঁৎ The Positive Philosophy গ্রন্থে Sociology কে একটি চূড়ান্ত বিজ্ঞান বলে উল্লেখ করেন। সমাজ বিজ্ঞান হচ্ছে জ্ঞানের এমন একটি শাখা যা সমাজ ও মানবিক আচরণ নিয়ে আলোচনা করে। বিভিন্ন পন্ডিত সমাজবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিয়েছেন। এল.এফ.ওয়ার্ডের মতে, সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজ সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞান, যেখানে সামাজিক ঘটমান বিষয় সমূহ পাঠ করা হয়। এমিল ডুর্খেইম এর মতে, সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান। অর্থাৎ সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজ ও সামাজিক সম্পর্ক সমূহের বিজ্ঞান। সুতরাং বলা যায় যে, সমাজবিজ্ঞান হলো সমাজের গঠন প্রণালী এবং পরিবর্তনশীল সমাজ কাঠামো সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ।

সমাজবিজ্ঞানের সাথে ইতিহাসের সম্পর্ক: 

ইতিহাসের সাথে সমাজবিজ্ঞানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ১) উভয়ের এর পটভূমি: মানুষের সমাজ এবং আলোচ্য বিষয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত সকল ঐতিহাসিক ঘটনা।  ২) উভয়েই সমাজ ও সমাজস্থ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। ৩) তবে ইতিহাস অতীতের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে এবং অতীতকে বর্তমানের কাছে অর্থবহ করে তোলে। ৪) সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাস উভয় ই তথ্যভিত্তিক। ৫) ইতিহাসে যেভাবে অতীতের ঘটনা উল্লেখ থাকে এমনি সমাজবিজ্ঞানে ও মানুষের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ এর তথ্য পাওয়া যায়। সুতরাং সমাজতত্ত্ব ও ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় অভিন্ন হলেও কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতাও থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ আলাদা করা সম্ভব নয়। কোন কোন সমাজ বিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন আবার কেউ কেউ অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান কে আলোচনা করেন।

ইতিহাসের উপর সমাজ বিজ্ঞানের নির্ভরশীলতা: 

মানব সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের ওপর সমাজবিজ্ঞান গুরুত্ব প্রদান করে। ইতিহাসের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজতাত্ত্বিক কাঠামো তুলে ধরেন। মানবসমাজে সংঘটিত সব ধরনের ঘটনার বিবরণ ইতিহাসে পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকরা সমাজবিজ্ঞানের জনক প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে। উদাহরণস্বরূপ: ১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে সংগঠিত ফরাসি বিপ্লবের কারণ বিশ্লেষণ করলে জানা যায় সামাজিক শ্রেণী বৈষম্য, স্তরবিন্যাসের কথা। কিন্তু বিপ্লব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য সমাজবিজ্ঞানীরা ইতিহাসের উপর নির্ভরশীল।

সমাজ বিজ্ঞানের উপর ইতিহাসের নির্ভরশীলতা: 

ইতিহাস ও বিভিন্নভাবে সমাজ বিজ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। সমাজবিজ্ঞান ইতিহাসের আলোচনায় সামাজিক পটভূমি প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ: ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ইতিহাসের কাছ থেকে জানা যায়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পটভূমি, প্রকৃতির ব্যাখ্যা সমাজবিজ্ঞান দিয়ে থাকে। সমাজতাত্ত্বিক অনুশীলন ছাড়া ইতিহাস অনুশীলনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকরা সমাজতাত্ত্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পার্থক্য: 

সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতাও আছে। ইতিহাসের আলোচনায় এমন অনেক বিষয় আছে যার সাথে সমাজবিজ্ঞানের সাদৃশ্য নেই। সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তাই। ১)  ইতিহাসের আলোচনা অতীতের ঘটনাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান সমকালীন বা নিকট অতীতের ঘটনাবলীর প্রতি আগ্রহী। ২) ইতিহাসের আলোচনা শুরু হয় কোন নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা দিয়ে। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞানের আলোচনা শুরু হয় কোন সাধারণ সূত্র থেকে। ৩) কেউ মনে করেন সমাজবিজ্ঞানে আলোচনার ধরণ বিমূর্ত, আর ইতিহাসের আলোচনা বাস্তব। ৪) সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বিধি নিষেধের পরিবর্তনে ঐতিহাসিকরা আগ্রহী কিন্তু সমাজবিজ্ঞানে এসব আলোচনার মুখ্য বিষয়। ৫) ইতিহাস স্থান, কালের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ঘটনাবলি আলোচনা করে। অন্যদিকে সমাজ বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয় হলো আন্তঃমানবিক সম্পর্ক বিষয়ক কাজ ব্যাখ্যা করা।

সমাজবিজ্ঞান ও  নৃবিজ্ঞান এর মধ্যে সম্পর্ক: 

সমাজবিজ্ঞানের সাথে নৃ-বিজ্ঞানের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। নৃবিজ্ঞানের একটি আলোচ্য বিষয় হল সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান। সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয় তাই সমাজবিজ্ঞানের সাথে নৃবিজ্ঞানের সম্পর্ক আছে। নৃবিজ্ঞান বর্তমানে আদিম সমাজ ছাড়াও গ্রাম এবং যান্ত্রিক সভ্যতার আশীর্বাদপুষ্ট নগর সমাজ সম্পর্কেও আলোচনা করে। সমাজ বিজ্ঞানে ও আধুনিক সমাজের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়। তাই বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্য আছে।

সমাজবিজ্ঞান ও  নৃবিজ্ঞান এর মধ্যে পার্থক্য: 

সমাজ বিজ্ঞান বৃহদাকার সমাজ নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে নৃবিজ্ঞান ক্ষুদ্র সমাজ নিয়ে গবেষণা করে। সমাজবিজ্ঞানীদের চেয়ে নৃবিজ্ঞানীরা সমাজের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে পারেন। কিন্তু সমাজ বিজ্ঞানীরা তা পারেন না। কারণ তারা বৃহৎ সমাজ নিয়ে গবেষণা করেন বলে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ হয় না।

সমাজবিজ্ঞান ও  অর্থনীতি এর মধ্যে সম্পর্ক: 

অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক। অর্থনীতির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো সম্পদ। সমাজ বিজ্ঞানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মানুষের সামাজিক জীবন। বিশ্বের সংঘটিত সব ঘটনার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ। অর্থনৈতিক ঘটনার জন্য সামাজিক কারণ ও দায়ী। তাই অর্থনৈতিক সমস্যাকে সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা হয়। মানুষের সামাজিক সম্পর্ক দ্বারা অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের দুটি নতুন শাখা হলো: 1) Economic Sociology 2) Industrial Sociology.

সমাজবিজ্ঞান ও  নৃবিজ্ঞান এর মধ্যে পার্থক্য: 

সমাজ বিজ্ঞানের পরিধি ব্যাপক। অন্যদিকে অর্থনীতিতে শুধুমাত্র সমাজের অর্থনৈতিক দিক আলোচনা করা হয়। উভয় বিষয় সামাজিক গবেষণার ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। সমাজবিজ্ঞান সার্বিক দিক আলোচনা করে, অর্থনীতি শুধু মানুষের বৈষয়িক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে। সমাজবিজ্ঞান অপেক্ষাকৃত নতুন বিজ্ঞান, পক্ষান্তরে অর্থনীতির আবির্ভাব আরো আগে ঘটেছে। পরিশেষে বলা যায়, সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় কোন ক্ষেত্রে অভিন্ন, আবার কোন ক্ষেত্রে ভিন্ন। সামাজিক বিজ্ঞানসমূহের অধিকতর বিকাশের স্বার্থেই ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের ভেতর ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো উচিত। উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ঐতিহাসিকগণ যখন ইতিহাস লিখেন, তখন তারা সমাজ বিজ্ঞান এর গবেষণার ফলাফল ব্যবহার করেন। একইভাবে সমাজবিজ্ঞানও ইতিহাসের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

Leave a Comment