সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি রহিতকরণের ইতিহাস।

সতীদাহ প্রথা হল স্বামীর মৃতদেহের সাথে বিধবা স্ত্রীকে জীবন্ত দাহ করার হিন্দু ধর্মীয় প্রথা। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০ বছরপূর্বে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ বেশ সম্ভ্রমের সাথে এটি পালন করলেও একসময় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। মধ্যযুগের অনেক মুসলিম নরপতি, গোয়ার পর্তুগিজ শাসনকর্তা এবং পেশোয়া বাজিরাও সতীদাহ প্রথা রহিত করার চেষ্টা করেন। ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার সতীদাহ প্রথা রহিত করে। সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি এর ইতিহাস নিচে বর্ণনা করা হল।

 সতীদাহ প্রথার উৎপত্তি: 

সতীদাহ প্রথা কবে এবং কিভাবে গড়ে উঠেছে তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৩০০ অব্দে গ্রিক লেখক ডিও ডোরাসের বর্ণনার সাথে ১৮ শতকের ভারত বর্ষে প্রচলিত সতীদাহের মিল পাওয়া যায়। ঋকবেদ, রামায়ণমহাভারতে সতীদাহ প্রথার উল্লেখ আছে। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতে ভারতবর্ষের অভিজাত দেশের মেয়েরা বিষ প্রয়োগে স্বামীকে হত্যা করত। তারা যাতে এই কাজ করতে না পারে তার জন্য স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকেও সহমরণে যাওয়ার বিধান থেকেই সতীদাহের উৎপত্তি হয়েছে। এ কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গ্রিক ঐতিহাসিক এরিস্টোবোলাস তক্ষশীলা শহরে সতীদাহ প্রথার ঘটনা সংরক্ষণ করেন। তবে প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল তাতে সন্দেহ নেই।

সতীদাহ প্রথার কারণ: 

ধর্মশাস্ত্র শঙ্খ, আঙ্গিরস, বৃদ্ধহারী সংহিতায় সতীদাহ প্রথা প্রসারের বিষয়ে যে তথ্য দেয়া হয়েছে তা হল, ১) বংশ মর্যাদা রক্ষা করা, ২) রাতারাতি লোকের কাছে দেবী হওয়ার লোভ, ৩) স্বামীর প্রতি ভালোবাসা, ৪) স্বামীকে নরক হতে উদ্ধারের বাসনা, ৫) বিধবা আত্মীয়ের আজীবন বোঝা বহনের দায় হতে মুক্তি, ৬) বৈধব্যের যন্ত্রণা হতে মুক্তি ইত্যাদি ছিল সতীদাহের অন্যতম কারণ। এমনকি বিধবা আত্মীয়ের ৭) সম্পত্তি গ্রাস করার লোভে অনেক নারীকে সতী হতে বাধ্য করা হত।

সতীদাহ প্রথার প্রকারভেদ: 

ভারতবর্ষীয় হিন্দু সমাজে প্রধানত ২ ধরনের সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। ১) সহমরণ ২) অনুমরণ। সদ্য মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রী একই চিতায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলে তাকে তাকে বলা হত সহমরণ। আবার স্বামীর ব্যবহৃত কোন বস্ত্র বা দ্রব্য নিয়ে স্ত্রী আলাদা চিতায় হয়ে দগ্ধ হয়ে মারা গেলে তাকে বলা হতো অনুমরণ। কখনও কখনও স্বামীর মৃতদেহের সাথে তার স্ত্রীকে জীবিত অবস্থায় সমাধিস্থ করা হতো। এ ধরনের রীতি কে বলা হত সহসমাধি। বিশেষ করে বাংলার যোগী সম্প্রদায়ের মধ্যে সহ সমাধি প্রথা প্রচলিত ছিল।

সতীদাহ প্রথার বীভৎস রূপ: 

 

সতীদাহ প্রথার বীভৎস রূপ (img src: wikimedia commomns)

সদ্য বিধবা নারী নববধূর মতো সাজে, তার শ্রেষ্ঠ পোশাক পরে সিঁদুর, কাজল, ফুলমালা, চন্দন, আলতায় সুসজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে সে চিতায় উঠে, তার স্বামীর পা দুটি বুকে আঁকড়ে ধরে আগুন জ্বলার জন্য অপেক্ষা করতো। স্ত্রীর শেষ মুহূর্তে বিচলিত না হতে আগে থেকেই আফিম বা উত্তেজক কিছু খাইয়ে বিধবা নারীকে আচ্ছন্ন করা হতো। বেশি ধোঁয়া হওয়ার জন্য কাঁচা কাঠ জ্বালানো হতো এবং বিধবার ক্রন্দন কেউ না শুনে মত হইহুল্লোড় করে শঙ্খ, ঘন্টা, ঢোল বাজানো হতো। যখন আগুনের লেলিহান শিখা অসহনীয় হয়ে উঠতো, বিধবার সিদ্ধির নেশা কেটে যেত, তখন বিধবা পালানোর চেষ্টা করলে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তাকে বারবার আগুনের দিকে ঠেলে দেওয়া হতো।

সতীদাহ প্রথার সামাজিক চিত্র: 

স্বামীর মৃত্যুর পর হতবিহ্বল অবস্থায় রমনীরা ভবিষ্যৎ লাঞ্ছনা, গঞ্জনা ও পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি হতে রক্ষা পেতে স্বামীর সাথে সহমরণে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতেন। ১৭৯৯ সালে নদীয়ার এক ব্রাহ্মণের ২২ জন স্ত্রী সহমৃতা হয়। একই সময়ে শ্রীরামপুরের নিকটবর্তী সুকচরা গ্রামে এক কুলীন ব্রাহ্মণ এর ১৮ জন স্ত্রী সহমৃতা হয়। ১৮০৪ সালে কলকাতার চতুর্দিকে ৩০ মাইল বিস্তৃত সীমানার মধ্যে প্রায় ৩০০ জন বিধবা সহমৃতা হয়।

১৮১২ সালে কাশিমবাজার হতে গঙ্গা নদীর মধ্যবর্তী স্থানে প্রায় ৭০ জন বিধবা সহমৃতা হয়। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ হতে শুরু করে কামার, কুমার, তেলি, সুতার, স্বর্ণকার, কৈবর্ত, নাপিত, তাঁতী প্রভৃতি জাতির বিধবা ছিল। তাদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ৬০ বছর। ১৮১৮ সাল থেকে ১৮২৮ সালের মধ্যে কলকাতা, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, পাটনা, বেনারস ও বেরিলী এই ছয় বিভাগে প্রতিবছর গড়ে ৬০০ জনের ও বেশি বিধবা সহমৃতা হতো। উল্লেখ্য যে, বাংলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা সহমরণ বেশি হত। [উৎস: রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলা দেশের ইতিহাস- আধুনিক যুগ- পৃষ্ঠা: ২৪০]

সতীদাহ প্রথা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত: 

অধিকাংশ সময় বিধবা নারীদের বাধ্যতামূলক সতী হতে বাধ্য করা হতো। কিন্তু স্বেচ্ছায় সতী হওয়ার ও অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজা রামমোহন রায়ের মতে, সতীদাহের ঘটনা অধিকাংশই স্বেচ্ছা প্রণোদিত নয়, এটির জোরপূর্বক সতী হত্যা।
খ্রিস্টান মিশনারী পেগস্ তার সাথে সম্পর্কিত পুস্তকে বলেন- ৪ টির মধ্যে ৩ টি সতীর ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করা হতো।
অন্যদিকে টমাস উইলিয়াম কেরি, উইলিয়াম ওয়ার্ড, রামমোহন রায় সতী হতে উদ্যত অনেক নারীকে বারবার ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। রামমোহন রায় নিজে কালীঘাটে এক সতীদাহ অনুষ্ঠানে হিন্দু চিকিৎসক নীলুর অল্পবয়সী দুইজন স্ত্রী কে ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় সতী হওয়ার যে প্রবণতা ছিল তা অস্বীকার করা যায় না। (সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি)

সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা: 

হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট এই প্রথার কঠোর সমালোচনা করে তার রচনা ‘কাদম্বরী’ তে বলেন, অনুমরণ পতিভক্তি এর লক্ষণ নয়। দক্ষিণ ভারতীয় লেখক দেবন ভট্ট এই প্রথার বিরোধিতা করেন। শ্রী চৈতন্যদেব এর উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না।

সতীদাহ প্রথা রহিত করণ: 

রক্ষণশীল হিন্দুধর্মাবলম্বীরা ভক্তির সাথে সতীদাহ প্রথা পালন করত। সময়ের বিবর্তনে প্রগতিশীল ও হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তিরা সতীদাহ প্রথা রহিত করার চেষ্টা করেন। মোগল সম্রাট সরাসরি সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ না করলেও নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হিন্দুরা তাতে বাধা দিলে খুব একটা এগোতে পারেননি। ইংরেজ সরকার এর কয়েক জন ম্যাজিস্ট্রেট সতীদাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে বলেন, উপদেশ ছাড়া যেন কাউকে সতীদাহ প্রথা থেকে নিবৃত্ত করতে কিছু করা না হয়। ১৮১৩ সালে এক সহকারী আদেশে বলা হয় গর্ভবতী হওয়ার আগে বিধবার সতীদাহ ম্যাজিস্ট্রেট রহিত করতে পারবেন।

১৮১৭ সালের বিধিতে বলা হয়, যার শিশুকে দেখার কেউ নেই, যার স্তন্যপায়ী সন্তান আছে এবং যে মহিলা গর্ভবতী তিনি সহমরণে যেতে পারবেন না। সহমরণের আগে পুলিশকে তা না জানানো হলে দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। কিন্তু তাতে বিশেষ উপকার হয় নি। ১৮১৮ সালে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তিনি ধর্মগ্রন্থের উক্তি তুলে ধরে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে সতীদাহ ধর্মবিরুদ্ধ এবং অশাস্ত্রীয় প্রথা। ১৮১৮ এবং ১৮১৯ সালে তিনি দুটি পুস্তিকা লিখে সতীদাহের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। বিভিন্ন শ্মশান ঘাটে গিয়ে মহিলাদের সতী হওয়া থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। সতীদাহ বন্ধের লক্ষ্যে রামমোহন রায় ৩০০ জন বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষর নিয়ে বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক এর কাছে জমা দেন। সমাচার দর্পণ, ইন্ডিয়ান গেজেট, ক্যালকাটা জার্নাল পত্রিকাগুলো রামমোহন কে সমর্থন জানায়। (সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি)

সতীদাহ প্রথা বিলুপ্তিতে লর্ড বেন্টিঙ্ক এর অবদান: 

লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৮ সালে গভর্নর-জেনারেল হয়ে আসার পর সতীদাহ আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। রাজা রামমোহনের কাছ থেকে শাস্ত্রীয় যুক্তি লাভ করে তিনি সতীদাহ রহিত করণে উদ্যোগী হন। তিনি সতীদাহ প্রথা বন্ধের ব্যাপারে ৪৯ জন সেনাপতির পরামর্শ নেন। এদের মধ্যে ২৪ জন অবিলম্বে সতীদাহ প্রথা রদ করার পক্ষে সায় দেন। মাত্র ৫ জন পরিবর্তন ঘটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেননি। বিচারকদের ৫ জনের মধ্যে ৪ জনই সতীদাহ রদ এর পক্ষে রায় দেন। পুলিশ বিভাগ ও বেন্টিংক কে সমর্থন জানায়। সবার সমর্থন এবং সাহায্য পেয়ে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন আইন দ্বারা সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

উপসংহার: 

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সংগঠিত সতীদাহ আন্দোলন ছিল বাংলার প্রথম সমাজ সংস্কার আন্দোলন। এই আন্দোলনের ফলে ভারতবর্ষের ইতিহাসে হাজার বছর ধরে প্রচলিত কুপ্রথার অবসান ঘটে। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, হিন্দু সংস্কারবাদী আন্দোলন এর ফলে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ সম্ভব হয়। (সতীদাহ প্রথা উৎপত্তি বিলুপ্তি)

Leave a Comment

Exit mobile version