বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সমগ্র পৃথিবী পুঁজিবাদী আমেরিকা ও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ৬০ ও ৭০ এর দশকের দিকে চীন বিশ্বরাজনীতিতে ৩য় শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমেরিকা ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের জন্য নৈতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমর্থন যুগালেও মার্কিন জনগণ, গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন সংস্থা, মার্কিন কংগ্রেস, সিনেটর বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। যুক্তরাজ্য নিরপেক্ষ ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা নিচে বর্ণনা করা হল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি: 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিপাবলিকান দলের রিচার্ড নিক্সন এবং প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার।  মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন সরকারের ভূমিকাকে কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়:

মার্কিন নীতির প্রথম পর্যায় ( মার্চ-জুলাই, ১৯৭১): এ পর্যায়ে মার্কিন নীতির প্রকৃতি ছিল কৌশলগত নিরপেক্ষতা। ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম সরকারি ঘোষণায় নিক্সন প্রশাসন বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও ৮ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি জোসেফ সিসকো সমস্যাটিকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট’ হিসেবে বিবেচনা করে। জনমত, পার্লামেন্ট ও সংবাদপত্রের চাপে মার্কিন সরকার ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ৯৩ লক্ষ শরণার্থীদের জন্য ২.৫ লক্ষ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য দেয়। পাশাপাশি পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সাহায্য ও অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। অক্টোবরে সৌদি আরব হয়ে ৭৪ টি মার্কিন জঙ্গি বিমান যায় পাকিস্তানে।

মার্কিন নীতির দ্বিতীয় পর্যায় ( জুলাই-আগস্ট, ১৯৭১): জুলাই মাসে কিসিঞ্জারের দিল্লি, পিন্ডি এবং গোপনে পিকিং সফরের মাধ্যমে নিক্সন প্রশাসনের পাকিস্তান ঘেঁষা নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পিন্ডি সফরের সময় মার্কিন-চীন সরকার যৌথভাবে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধীদল ও জনমতকে বিভ্রান্ত করতে বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত পাকিস্তানে অস্ত্র ও আর্থিক সাহায্য না দেয়ার ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানপন্থী চীন-মার্কিন ঐক্যজোটের কারণে ভারত নিজস্ব নিরাপত্তা বজায় রাখতে ৯ আগস্ট, ১৯৭১ সালে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

মার্কিন নীতির তৃতীয় পর্যায় ( সেপ্টেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর ১৯৭১): এ পর্যায়ে পাক-ভারত বৃহত্তর যুদ্ধ রোধে মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে সহযোগিতার পাশাপাশি আগস্ট-অক্টোবরে কলকাতাস্থ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধ বন্ধ করতে সমঝোতার প্রস্তাব দেয় এবং প্রস্তাবে শেখ মুজিবুরের মুক্তি এবং বাংলাদেশকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে রাজি হলেও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া কোন সমাধানে যেতে রাজি হয়নি।

তাই পাক-ভারত যুদ্ধ রোধের মার্কিন উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওয়াশিংটন সফরে গেলে মার্কিন সরকার পাকিস্তান কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশ সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেয় কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। মার্কিন নীতির এই ব্যর্থতার ফলে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক পাক-ভারত সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অক্টোবর-নভেম্বরে মার্কিন সরকার গোপনে জর্ডান, সৌদি আরব, লিবিয়া, তুরস্ক ও ইরানের মাধ্যমে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করে।

মার্কিন নীতির চতুর্থ পর্যায় ( ৩-১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১): ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে মার্কিন সরকার যুদ্ধের জন্য ভারতকে দায়ী করে। ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘে মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ ভারতকে প্রধান আক্রমণকারী রাষ্ট্র হিসেবে অভিযুক্ত করেন। ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য ৮৬.৬ মিলিয়ন আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেয়। ৭ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে কিসিঞ্জার ভারতকে আক্রমণকারী রাষ্ট্র ও বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত করেন। ৮ ডিসেম্বর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা C.I.A ভারত কর্তৃক কাশ্মির দখলের সংবাদ দেয় কিন্তু ডেপুটি এ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ভ্যান তা অস্বীকার করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

পাকিস্তানকে সহযোগিতার জন্য এবং মস্কো ও দিল্লির উপর চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন Gunboot Diplomacy প্রয়োগ করতে বিমানবাহী পারমাণবিক জাহাজ ‘এন্টারপ্রাইজের’ নেতৃত্বে ৮ টি জাহাজের টাস্ক ফোর্স বঙ্গোপসাগরে পাঠানোর নির্দেশ দেন। যদিও ২৪ ঘন্টার মধ্যে তা প্রত্যাহার করা হয়। যুদ্ধে ভারতের অগ্রগতি রোধে জাতিসংঘে মার্কিন যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাব সোভিয়েত ভেটোর ফলে নাকচ হয়। তা সত্ত্বেও জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব অব্যাহত রাখে।  ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ভারত যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হলে যুক্তরাষ্ট্র অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পায়।

মার্কিন জনমত, সংবাদ মাধ্যম, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তান ঘেঁষা নীতি অনুসরণ করলেও মার্কিন জনমত, সংবাদ মাধ্যম, মার্কিন বুদ্ধিজীবী ছিল বাঙালিদের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। আমেরিকানরা সর্বত্র সাহায্য সমিতি প্রতিষ্ঠা করে জনমত গঠন করে এবং বাংলাদেশ সংকটে ন্যায় সঙ্গত ভূমিকা পালনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। মার্কিন সংবাদপত্র বিশেষ করে New York Times, Washington Post, Christian Science Monitor প্রভৃতি বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল। ২২ এপ্রিল, ১৯৭১ International Committee on University Emergency (ICUE) নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষকসহ ১০০ এর বেশি বুদ্ধিজীবীর বিবৃতিতে বাংলাদেশে শিক্ষকসহ ছাত্র গণহত্যার নিন্দা করা হয়।

Association for Asian Studies এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রায় ২০০০ শিক্ষাবিদ অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধ এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাকে অনুরোধ জানায়।

মার্কিন বিভিন্ন সংস্থা এবং Concert for Bangladesh:

মার্কিন শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় গোষ্ঠী, গবেষক গণ আমেরিকায় ‘বাংলাদেশ বন্ধু সমিতি’ গড়ে তোলে চাঁদা সংগ্রহ করেন এবং জনমত সৃষ্টি করেন। রিচার্ড টেইলারের Friend Society বাল্টিমোরে এবং ফিলাডেলফিয়ার নৌ অবরোধ করে পাকিস্তানের জন্য সমরাস্ত্র জাহাজে তোলা নিষিদ্ধ করে দেয়।International Commission of Jurist বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধে জোরালো তৎপরতা দেখায়। ১ আগস্ট, ১৯৭১ সালে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে পন্ডিত রবিশঙ্কর (ভারত), বিটলস্ ম্যানেজার এলেন ক্লাইন ও জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে প্রায় ২৫ জন শিল্পীর উপস্থিতিতে Concert for Bangladesh অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গভঙ্গের কারণ। হিন্দু সমাজ কেন এর বিরোধিতা করেছিল?

দু’বারে প্রায় ৪০ হাজার দর্শক কনসার্টে উপস্থিত হন এবং কনসার্ট থেকে সংগৃহীত ১০ লক্ষ ডলার মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে দান করা হয়। আগস্ট মাসে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হলে মার্কিন সিনেট এবং কংগ্রেস তার প্রতিবাদ করে। তাদের চাপেই মার্কিন সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে আর অগ্রসর হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাঃ 

মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার তিনটি পর্যায় ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

প্রথম পর্যায় (মার্চ – জুলাই): এ পর্যায়ে সোভিয়েত নীতিতে সতর্কতা লক্ষ্য করা যায়। ২ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নি বাংলাদেশে গণহত্যায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি ও আওয়ামীলীগের সাথে রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলাদেশী শরণার্থীদের আর্থিক সহায়তা ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিভিন্ন রাজ্যে শরণার্থীদের স্থানান্তরে সোভিয়েত দু’টি পরিবহন বিমান দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

দ্বিতীয় পর্যায় (আগস্ট – নভেম্বর): এ পর্যায়ে পাকিস্তানপন্থী চীন-মার্কিন ঐক্যজোটের কারণে নিজস্ব নিরাপত্তা বজায় রাখতে ৯ আগস্ট, ১৯৭১ সালে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে। সেপ্টেম্বরে ইন্দিরা গান্ধী রাশিয়া সফরকালে রুশ নেতারা বাঙালিদের ন্যায় সঙ্গত দাবি পূরণ, ভারতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ব্যাপারে সম্মত হন। ভারত চেয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ, সোভিয়েত চেয়েছে অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা।

তৃতীয় পর্যায় (নভেম্বর – ডিসেম্বর): ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে সোভিয়েত সরকার যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযানের নিন্দা করে। ৪ ডিসেম্বর থেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব যুদ্ধ বিরতির চেষ্টা চালায়। ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর ঢাকা দখল করার আগ পর্যন্ত ৪, ৭, ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন যুদ্ধ বিরতি প্রস্তাবে সোভিয়েত তিন বার ভেটো দেয়। মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিপরীতে রুশ যুদ্ধজাহাজ বঙ্গোপসাগরে প্রেরণের ঘোষণা পাকিস্তান বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বাঙালিকে স্বাধীন ভাবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করে।
এভাবে দেখা যায়, সোভিয়েত শুরু থেকে মধ্যপন্থী হলেও শেষ পর্যায়ে কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ পন্থী নীতি গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

চীনের ভূমিকাঃ

প্রফেসর সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অনুসৃত চৈনিক নীতির দু’টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। প্রথমত, চীন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখায়নি। দ্বিতীয়ত, চীন পাকিস্তান সরকারের অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হলে চীন যুদ্ধের জন্য সোভিয়েতকে দায়ী করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ৫ ও ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমাধান বের করার জন্য দু’টি প্রস্তাব উত্থাপন করলে চীন তাতে ভেটো দেয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রস্তাবের পক্ষে মত দেয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশকে সোভিয়েত-ভারতের সৃষ্টি বলে মন্তব্য করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

ভারতের ভূমিকাঃ 

বিদেশি রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে ভারত সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। মুক্তিযুদ্ধের ন’মাস ভারত শরণার্থীদের আশ্রয় ও ভরণপোষণ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ, বহির্বিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন, মিত্র – যৌথবাহিনী গঠন করে একযোগে পাকিস্তানকে হঠিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করে।

প্রথম পর্যায় (মার্চ – এপ্রিল): ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হলে বিপুলসংখ্যক বাঙালি ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। এসময় ভারত সীমান্ত খুলে দেয় এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভারতীয় এলাকায় রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়। ভারত সরকার ভারতবাসীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের মধ্য দিয়ে বাঙালি শরণার্থীদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেয়। এসময় কলকাতায় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ স্থাপিত হয় এবং ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে পত্রপত্রিকা প্রকাশের সুযোগ দেয়া হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

দ্বিতীয় পর্যায় (মে-জুন): এপ্রিলের শেষের দিকে পাক-বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধির ফলে ভারত সরকার ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাঙালি যুবকদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয় এবং ৪ সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে হালকা অস্ত্র ও গোলা বারুদসহ দেশে পাঠানো হয়। জুনে পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরন সিং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়াসহ ৬ টি দেশ সফর করেন এবং আরো ৫ জন মন্ত্রী ও বিভিন্ন প্রতিনিধিকে ইউরোপ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। ভারতীয় তৎপরতার ফলে বিশ্ব ব্যাংক ও যুক্তরাজ্য পাকিস্তানে আর্থিক সাহায্য স্থগিত করে দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

তৃতীয় পর্যায় ( জুলাই – নভেম্বর): জুলাই মাসে ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানের বিভিন্ন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর ফলে পাকিস্তানি সীমান্ত ঘাঁটি অকেজো হয়ে পড়লে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাগণ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সহজ হয়। আগস্টের মাঝামাঝি ভারতে প্রশিক্ষণ প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ২০ হাজারে উন্নীত করা হয়। এ পর্যায়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও যৌথবাহিনী গঠিত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

চতুর্থ পর্যায় (৩-১৬ ডিসেম্বর): ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের সূচনা এবং মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ৬-১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে যৌথবাহিনীর অভিযানে লাকসাম, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, চাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বড় অংশ এবং ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার আশেপাশের এলাকার পতন ঘটে। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়।

ভারতীয় পার্লামেন্ট, গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও ভারতবাসীর ভূমিকাঃ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কংগ্রেস, মুসলিম লীগসহ ভারতের সকল রাজনৈতিক দল সমর্থন দেয়। পশ্চিম বঙ্গের রাজ্যসভার চাপে ভারত সরকার মার্চেই মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়। ২৫ মার্চ গণহত্যার চিত্র প্রথম তুলে ধরে ভারতীয় পত্রিকা। ২৭ মার্চ সমগ্র পশ্চিম বঙ্গে  গণহত্যার প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট হয়। ৩১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা ধর্মঘট করেন। ভারত সরকারের হিসেবে, শরণার্থীদের পেছনে মোট খরচ হয় ৩৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ১৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ভারত নিজে বহন করে। ভারতীয় বাহিনীর প্রায় ২০০০ সদস্য নিহত, ৫০০০ আহত এবং ২০০০ নিখোঁজ হয়‌।

যুক্তরাজ্যের ভূমিকাঃ 

যুক্তরাজ্যের সরকার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রথমে সতর্কতা অবলম্বন করলেও বহুমুখী চাপে পাকিস্তানে জীবন নাশ ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট’ বলে অভিহিত করে। আগস্ট মাসে মুজিবের বিচার শুরু হলে ব্রিটিশ সংসদ সদস্য ও জনমতের চাপে শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষায় ব্রিটিশ সরকার ইয়াহিয়াকে অনুরোধ জানান। সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ চাপেই ডা. আব্দুল মালিকের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সাক্ষীগোপাল বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ সরকার শরণার্থীদের জন্য অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৫ মিলিয়ন পাউন্ড সাহায্য দেয়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম, বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা: 

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার গঠনের পর এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বের জনমত ও রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায় করা। এ উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকারের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদলকে ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৬ তম অধিবেশনে প্রেরণ করা হয়।

উপসংহার:

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস চীন এবং আমেরিকা পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসে। কারণ আমেরিকা চায়নি সোভিয়েত ইউনিয়ন এশিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করুক। চীন মনে করেছিল বাংলাদেশ সৃষ্টি হলে দেশটি সোভিয়েত ও ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে। পাক বাহিনী আত্মসমর্পণের পর উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো ৬০% চৈনিক এবং ৪০% মার্কিন ছাপযুক্ত ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় সাহায্য হচ্ছে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে ভেটো দেয়া। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা

2 thoughts on “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা।”

Leave a Comment

Exit mobile version