প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার কি?এর বৈশিষ্ট্য। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার বা জ্ঞান দীপ্ত স্বৈরাচার হল এমন এক ধরনের শাসন ব্যবস্থা যেখানে রাজা বা শাসক স্বৈরাচারী হয়েও জ্ঞান বা যুক্তির আলোকে আলোকিত এবং সর্বদা প্রজার কল্যাণে নিয়োজিত থাকেন। আঠারো শতকের ইউরোপের কয়েকটি দেশের রাজারা জ্ঞানদীপ্ততায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের প্রজাদের কল্যাণে এগিয়ে আসেন এবং সংস্কার সাধন করেন। এসকল শাসকদের মধ্যে প্রাশিয়ার ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম বা মহামতি ফ্রেডারিখ ছিলেন অন্যতম। তার আমলে কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষার উন্নতি হয় এবং প্রাশিয়ার রাজ্যসীমা সম্প্রসারিত হয়। এছাড়া তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, আইন সংস্কার, এবং নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজ সম্পন্ন করেন। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম এর পরিচয়: 

ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম 1722 সালে জন্মগ্রহণ করেন। ফ্রেডারিখ প্রথম উইলিয়াম ছিলেন তার পিতা।প্রথম ফ্রেডারিখ উইলিয়াম এর মৃত্যুর পর 1740 সালে ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম প্রুশিয়া/প্রাশিয়ার (বর্তমান নাম জার্মানি) সিংহাসন লাভ করেন। তিনি ইতিহাসে ফ্রেডারিখ দি গ্রেট নামে পরিচিত। সমকালীন ইউরোপে জ্ঞানদীপ্ত শাসক, কূটনীতিবিদ, সামরিক দূরদর্শিতা সহ অনেক গুণে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। শাসক হিসেবে তার প্রতিভা ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের প্রধান সেবক মনে করতেন। তিনি বলতেন, “The monarch is not the absolute master, but only the first servant of the state”. প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার বলতে কী বোঝায়: 

অষ্টাদশ শতাব্দীর স্বৈরাচারী শাসকরা জ্ঞান দীপ্ততায় অনুপ্রাণিত হয়ে দেশে আইন, শিক্ষা এবং সমাজ ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করেছিলেন যা প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার নামে পরিচিত। অষ্টাদশ শতকের পূর্বে শাসকরা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবি করতেন। তাই তাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল যে, পৃথিবীর কোন কিছুর কাছেই তারা কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। প্রজাদের কল্যাণের জন্য কোন কিছু করা সেটা ও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। ইংল্যান্ডে তা নিয়ে রাজা এবং বিচারকদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। অষ্টাদশ শতকের যুক্তিবাদী দর্শন রাজাদের এই বিশ্বাসের দুর্বলতা উদঘাটন করে।
ফরাসি দার্শনিক মন্টেস্কু রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং রাজার দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন ধারণা প্রদান করেন। এই ধারণা মতে সমাজ এবং জনকল্যাণের জন্যই রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। রাজ্যের ক্ষমতার পাশাপাশি তার অবশ্য পালনীয় কিছু কর্তব্যও আছে। দার্শনিকদের জ্ঞানদীপ্ত ভাবধারায় প্রভাবিত হয়ে রাজারা প্রজাহিতৈষী শাসন প্রবর্তন করেন। নতুন ধারণায় তারা বিশ্বাস করেন রাজার ক্ষমতা হবে অসীম কিন্তু তিনি জাতির সমৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করবেন। জনকল্যাণ হবে তার শাসন কাজের ভিত্তি। দ্বিতীয় ফ্রেডারিখ, প্রথম পিটার, দ্বিতীয় ক্যাথেরিন, মেরিয়া থেরেসা, দ্বিতীয় লিওপোল্ড প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার ছিলেন। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারের বৈশিষ্ট্য:

১) শাসনকার্য প্রজাদের কল্যাণে পরিচালিত হলেও প্রশাসনিক কাজে তাদের অংশগ্রহণ থাকবেনা।
২) জ্ঞানদীপ্ত শাসকেরা মনে করতেন রাষ্ট্র সবকিছুর উপরে। রাজা প্রজা সবাই মিলে রাষ্ট্রের জন্য কাজ করবে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলেই জনগণের নিরাপত্তা এবং সুখ নিশ্চিত হবে।
৩) রাজা জনকল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করবেন। প্রজাদেরকেও সংস্কার মেনে চলতে হবে।
৪) জ্ঞান দীপ্ত রাজারা নিজেদের রাষ্ট্রের প্রতিনিধি মনে করতেন। জনগণ রাজার আদর্শ মেনে চলবে।

প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে প্রাশিয়ার রাজা মহান ফ্রেডারিখ:

জনহিতৈষী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা: ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীকরণ এর পথ অবলম্বন করেন। তার রাজত্বকালে তিনি প্রুশিয়াকে সর্বোত্তম প্রশাসন দেওয়ার চেষ্টা করেন। তার কর্মকর্তাদের পাঠানো সকল চিঠিপত্র, অভিযোগ তিনি নিজেই পড়তেন। যতদূর সম্ভব কর্মচারীদের উপর নজর রাখার চেষ্টা করতেন। তবে কেউ কোনো কাজে অবহেলা করলে তার প্রতি নির্দয় ছিলেন। তিনি তার শাসন নীতি জনকল্যাণমূলক বলে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “জনগণ শাসকের জন্য নয় বরং শাসকই হচ্ছেন জনগণের জন্য”। জনকল্যাণের জন্য তিনি কিছু সংস্কার প্রবর্তন করেন।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা: তিনি মার্কেনটাইল অর্থনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। (মার্কেন্টাইল অর্থনীতির বলতে বুঝায় কোন দেশে আমদানি কম,রপ্তানি বেশি)। দেশের টাকা বাইরে যাওয়া তিনি পছন্দ করতেন না। এজন্য তিনি দেশেই প্রয়োজনীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করেন। এর ফলে আমদানি কমে যায় এবং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তিনি বৈজ্ঞানিক খামার পদ্ধতি প্রচলন, অনাবাদি জমি পরিষ্কার করে ফসলি জমিতে পরিণত করেন। সরকারি রাজস্ব কে সঠিক কাজে ব্যয় করা তার উদ্দেশ্য ছিল। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

জনকল্যাণমূলক কার্যাদির সমাধান: জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল খনন, কৃষকদেরকে সহজ শর্তে ঋণ গান, আইন-কানুন সংস্কার, স্কুল প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক কাজ করেন।

ধর্মীয় উদারতা: ধর্মীয় দিক থেকে তিনি ইউরোপের সবচেয়ে সহনশীল শাসক ছিলেন। সে সময় প্রুশিয়া প্রোটেস্ট্যান্ট অধ্যুষিত রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও প্রোটেস্ট্যান্টবাদ সম্পর্কে তার কোনো উৎসাহ ছিল না। খ্রিষ্টধর্মের নৈতিকতা সম্পর্কে তার সন্দেহ ছিল এবং বাইবেল সম্পর্কে তার আস্থা ছিল না। সকল ধর্মযাজকদের তিনি অবজ্ঞা করতেন। তিনি ঘোষণা করতেন সকল ধর্মকে সহিষ্ণুতার চোখে দেখতে হবে এবং প্রত্যেকের মতো করে প্রত্যেককে স্বর্গে যাবার অনুমতি দিতে হবে।

কৃষকদের কল্যাণে ব্যবস্থা গ্রহণ: সপ্তবর্ষী যুদ্ধের সময় দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ছিল কৃষক। সপ্তবর্ষের যুদ্ধের পর তিনি কৃষিখাতে নজর দেন। যুদ্ধের যেসব কৃষক আক্রমণের শিকার হয় তাদের বীজ প্রদান করেন। গবাদি পশু এবং জমি চাষ করার জন্য ঘোড়া সরবরাহ করেন। ঘরবাড়ি পুনঃ নির্মাণ করে দেন এবং হত দরিদ্র কৃষকদের উপর থেকে সাময়িকভাবে কর আদায় স্থগিত করেন। ফলে কৃষকরা নিজেরাই নিজেদের কল্যাণ করতে পারে। এমনকি দেশের উন্নয়নের সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

আইন সংস্কার: আইন সংক্রান্ত সংস্কার ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম এর শাসনামলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বিচারকার্যে তিনি শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করার বিধান করেন। অসৎ আইনজীবীদের বহিষ্কার করেন। দেশে আইন সম্মত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্যোগে এই আইনকে লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

শিক্ষা ব্যবস্থা: শিক্ষার প্রতি ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম এর স্বাভাবিক অনুরাগ ছিল। তিনি বলেন শিক্ষা যেকোনো সরকারের মূলনীতি হওয়া উচিত। তিনি বার্লিনে “অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স” প্রতিষ্ঠা সহ বেশকিছু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তার সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তার সংস্কার গুলো ছিল অগুরুত্বপূর্ণ। তার সময়ে শিক্ষকরা ছিল কারিগর এবং অকার্যকর সৈনিক। তিনি তার অবসর সময়ে দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। এই সাহিত্যিকদের নিয়েও সময় কাটাতেন।

সেনা বাহিনী গঠন: মহান পেড়ারিক শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী গঠন করেন। তিনি সেনাবাহিনীর ব্যয় মেটানোর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলা, নিয়মিত কুচকাওয়াজ, অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র প্রশিক্ষিত অফিসার নিয়োগ করেন। এভাবে তিনি প্রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেন। ফলে প্রাশিয়া একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যার প্রেক্ষিতে পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদে তিনি অংশ নিয়ে পশ্চিম প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে সাইলেসিয়া আদায় করেন। রাশিয়া আয়তনে, জনসংখ্যায় এবং অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ হয়। যা পরবর্তীতে জনকল্যাণ বয়ে আনে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম এর শাসনামলে বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন সংবাদপত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়। ধর্মীয় সমালোচনার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতো।

সাম্রাজ্য বিস্তার: ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম সুদক্ষ সেনাপতি ছিলেন। অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ফ্রান্সের আক্রমণ থেকে প্রাশিয়াকে রক্ষা করেন। অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে সাইলেসিয়া এবং পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদে অংশ নিয়ে পশ্চিম প্রাশিয়া নামক স্থান দখল করেন। সপ্তবর্ষী যুদ্ধে সেক্সনি দখল করেন। ফলে রাশিয়ার আয়তনে ও জনসংখ্যায় শক্তিশালী হয়।

প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে ফ্রেডারিখ দ্বিতীয় উইলিয়াম এর মূল্যায়ন: 

ফ্রেডারিখ এর স্বৈরাচারের মূল উদ্দেশ্য ছিল জনকল্যাণ। তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন পছন্দ করতেন না। তার কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক উন্নয়নে নিয়োজিত ছিল। তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের প্রধান সেবক মনে করতেন। তার নীতি পর্যালোচনা করলে এই কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই তাকে প্রকৃতই প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচারী বলা যায়। ঐতিহাসিক কার্লাইল তাকে “Last of the king’s” বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

সমালোচনা: 

অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে সাইলেসিয়া দখল করায় ইউরোপীয় রাষ্ট্র গুলোর সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। তিনি সাময়িকভাবে কৃষকদের করমুক্ত করলেও কৃষকদের ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্ত করেন নি। ভূমিদাস প্রথা বিলোপের জন্য কোনো উদ্যোগ নেননি। দেশের সামাজিক দুর্নীতি-অনাচার অসাম্যতা দূর করার চেষ্টা করেননি। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাকে উদার বলা হলেও এক আইনের মাধ্যমে ইহুদিদের অধিকার সীমিত করা হয়। উল্লেখিত সমালোচনা সত্ত্বেও তৎকালীন ইউরোপে রাশিয়ার উন্নতির জন্য তিনি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

Source:

1) Europe- From The Renaissance to Waterloo > Robert Ergang.
2) A History of the Modern World > R. R. Palmer.
3) A Political and Social History of Europe > Hayes.
4) আধুনিক ইউরোপ > ড. কিরণ চন্দ্র।
5) আধুনিক ইউরোপ > মোঃ রমজান আলী আকন্দ।

প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ

2 thoughts on “প্রজাহিতৈষী স্বৈরাচার কি?এর বৈশিষ্ট্য। প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে মহান ফ্রেডারিখ”

Leave a Comment