পরিবার কি? এর প্রকারভেদ এবং আধুনিক সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকাইভারপেজের মতে, ‘পরিবার হচ্ছে এমন একটি গোষ্ঠী, যাকে সুস্পষ্ট জৈবিক সম্পর্কের দ্বারা সুনির্দিষ্ট করা হয়। এটাই সন্তান-সন্ততির জন্মদান ও তাদের লালন-পালনের একটি প্রতিষ্ঠান।’ ইংরেজি Family শব্দটি ল্যাটিন Familia থেকে এসেছে। পরিবার একটি জৈবিক একক, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যৌন সম্পর্ক বিদ্যমান। সমাজের অন্য যে কোন গোষ্ঠীর চেয়ে পরিবার নামক মুখ্য গোষ্ঠীর সদস্যরা জৈবিক ভাবে একে অন্যের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। শিশুদের সামাজিকীকরণ পরিবারেই প্রথম শুরু হয়। এটি একটি সার্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত। সমাজবিজ্ঞানী ল্যান্ডবার্গ তার Foundations of Sociology (1956) গ্রন্থে বিবাহের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন তা হল, ‘বিবাহ হচ্ছে এমন কতকগুলো নিয়ম নীতি ও আইন কানুন, যা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব কর্তব্য এবং সুযোগ-সুবিধাকে সংজ্ঞায়িত করে।’ বিবাহ হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে নারী পুরুষ পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করে। এটি একটি স্থায়ী সম্পর্ক যেখানে একজন নারী এবং একজন পুরুষ সমাজ স্বীকৃত ভাবে সন্তান জন্মদানের অধিকার অর্জন করে।

পরিবারের প্রকারভেদ: 

সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরা যেসব এর ভিত্তিতে পরিবারকে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন তা হল: কর্তৃত্ব, কাঠামো, বাসস্থান, বংশানুক্রম, আন্ত: গোষ্ঠী ও বহির্গোষ্ঠী সম্পর্ক এবং রক্তের সম্পর্ক।

১) কর্তৃত্বের ভিত্তিতে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) পিতৃতান্ত্রিক পরিবার: কর্তৃত্ব পিতা বা স্বামীর হাতে ন্যস্ত থাকে।
খ) মাতৃতান্ত্রিক পরিবার: কর্তৃত্ব স্ত্রী বা মায়ের হাতে ন্যস্ত থাকে।

২) কাঠামোর দিক থেকে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) অনু পরিবার: যে পরিবারে শুধু স্বামী স্ত্রী ও তাদের সন্তান সন্ততি থাকে।
খ) সম্প্রসারিত পরিবার: একাধিক অনু পরিবারের সমষ্টি। যেমন: হিন্দু সমাজের যৌথ পরিবার।

৩) বাসস্থানের দিক থেকে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) পিতৃস্থানীয় পরিবার: স্ত্রী, স্বামীর বাড়িতে বসবাস করে।
খ) মাতৃস্থানীয় পরিবার: স্বামী, স্ত্রীর পিতার বাড়িতে বসবাস করে।

৪) বিবাহের ভিত্তিতে পরিবার ৩ প্রকার। যথা:
ক) একক বিবাহ ভিত্তিক পরিবার: একজন পুরুষ, একজন স্ত্রী।
খ) বহু স্ত্রী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার: একজন পুরুষ, বহু স্ত্রী।
গ) বহু স্বামী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার: একাধিক পুরুষ, একজন নারী।

৫) বংশানুক্রমের ভিত্তিতে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) মাতৃ সূত্রীয় পরিবার: মাতা ই বংশানুক্রমের মূল ভিত্তি। মাতা ই পরিবারের পূর্বপুরুষ।
খ) পিতৃ সূত্রীয় পরিবার: পিতা বংশানুক্রম এর মূল ভিত্তি। পিতা পরিবারের পূর্বপুরুষ।

৬) আন্ত: গোষ্ঠী ও বহির্গোষ্ঠী সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) আন্ত: গোষ্ঠী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার: বিবাহ শুধুমাত্র আপন গোষ্ঠীর মধ্যে স্বীকৃত।
খ) বহির্গোষ্ঠী বিবাহ ভিত্তিক পরিবার: আপন গোষ্ঠীর বাইরে ও বিবাহ অনুমোদিত।

৭) রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবার ২ প্রকার। যথা:
ক) দাম্পত্য পরিবার: বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী, তাদের সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়বর্গ নিয়ে গঠিত।
খ) সগোত্র পরিবার: সকল আত্মীয় ও তাদের সন্তান সন্ততি নিয়ে গঠিত।

আধুনিক বাংলাদেশী সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ সমূহ:

অধিক নগরায়ন: নগরায়ন বৃদ্ধির ফলে গ্রামের যৌথ পরিবার গুলো ভেঙে যাচ্ছে। শহরে গড়ে ওঠে ছোট ছোট পরিবার। এখানে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং সংহতি কম হওয়ায় বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পায়। গ্রামীণ সমাজে শক্তিশালী সংহতির কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের হার অনেক কম।
ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব: নারী শিক্ষার প্রসারের ফলে নারীদের স্বাধীনতার স্পৃহা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তারা বাইরে কাজ করার সুযোগ পাওয়া তে পুরুষের উপর নারীদের নির্ভরশীলতা কমে গেছে। এর ফলে বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
যোগাযোগ বৃদ্ধি: চাকুরী ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মেলামেশা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের পরস্পর পছন্দের স্বাধীনতা ও বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ একটা মেয়ে সপ্তাহে ৪০ ঘন্টা ব্যাংকে কাজ করে। এতে তার ছেলে সহকর্মীর সাথে সম্পর্ক ভালো হয় এবং যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। যা বিবাহ-বিচ্ছেদের অন্যতম কারণ।
আইনের শিথিলতা: বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত কঠোর আইন কানুন বিবাহ বিচ্ছেদের হার কে হ্রাস করতে পারে। হিন্দু ধর্মে তালাক দেয়া যায় না কিন্তু আইনের শীতলতার কারণে তালাক সহজ। বিবাহ বিচ্ছেদ সংক্রান্ত শিথিল আইন এবং ধর্মীয় অনুশাসন পালন না করার ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ বৃদ্ধি পায়।
সন্তান সন্ততি না থাকা: শিল্পায়নের ফলে জন্মহার হ্রাস পায়। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সন্তান-সন্ততি কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারলেও সন্তানসহ দম্পতির সন্তান ছাড়া দম্পতি সহজেই বিবাহ-বিচ্ছেদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
উচ্চ উল্লম্বী সামাজিক গতিশীলতা: এ ধরনের গতিশীলতায় দম্পতিরা সামাজিক পরিবেশে নিজেদের সমভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সমর্থ নাও হতে পারে। এতে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি পায়।

উপরোক্ত কারণগুলো ছাড়াও স্বামী-স্ত্রীর মতের অমিল হওয়া, শারীরিক নির্যাতন, যৌতুকের প্রভাব, শারীরিক অক্ষমতা ও অসুস্থতা, বিবাহ বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর সন্দেহ, অবিশ্বাস, পরকীয়া, নিজেদেরকে সময় দিতে না পারা, বয়সের পার্থক্য ইত্যাদি বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ।

Leave a Comment